সব জ্ঞান সমান নয়। নবীজি ﷺ উপকারী জ্ঞানের জন্য দোয়া করতেন, আর অনুপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাইতেন। জ্ঞান অর্জনের রয়েছে নিজস্ব আদব: বিশুদ্ধ নিয়ত, যাচাই করে গ্রহণ, না জেনে কথা না বলা, এবং অজানা বিষয় বিজ্ঞজনকে জিজ্ঞেস করা। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
- উপকারী জ্ঞানের দোয়া
- অনুপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয়
- না জেনে কথা বলা নিষেধ
- যা শোনা, তা-ই বলা নয়
- সংবাদ যাচাই করা
- জানা না থাকলে জিজ্ঞেস করা
- আলেমদের বিদায় ও অজ্ঞদের ফতোয়া
- লোক দেখানো জ্ঞানের পরিণতি
উপকারী জ্ঞানের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।” নবীজি ﷺ ফজরের নামাজে সালাম ফেরানোর পর এ দোয়া পড়তেন।
সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস ৯২৫ (শাইখ আলবানি: সহিহ) — উম্মু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত
অনুপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয়
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ، وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَهَا
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে যা উপকারে আসে না, এমন অন্তর থেকে যা বিনয়ী হয় না, এমন প্রবৃত্তি থেকে যা তৃপ্ত হয় না, এবং এমন দোয়া থেকে যা কবুল হয় না।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭২২ — যায়েদ ইবনু আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত
উপকারী জ্ঞান সেটি, যা আল্লাহর ভয় বাড়ায়, আমলে রূপ নেয় এবং মানুষের কল্যাণে আসে। যে জ্ঞান অহংকার, বিতর্ক বা গুনাহের দিকে নিয়ে যায়, তা উপকারী নয়।
না জেনে কথা বলা নিষেধ
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর, এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১১০; সহিহ মুসলিম (ভূমিকা), হাদিস ৩ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
তাই সূত্র যাচাই না করে কোনো কথা “হাদিস” বলে প্রচার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বর্ণনার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি।
যা শোনা, তা-ই বলা নয়
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই (যাচাই না করে) বলে বেড়ায়।”
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা), হাদিস ৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
সংবাদ যাচাই করা
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও। নইলে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসবে, তারপর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।”
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬
জানা না থাকলে জিজ্ঞেস করা
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।”
সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩
আলেমদের বিদায় ও অজ্ঞদের ফতোয়া
“আল্লাহ বান্দাদের অন্তর থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নিয়ে তা তুলে নেবেন না। বরং আলেমদের তুলে নেওয়ার (মৃত্যুর) মাধ্যমে জ্ঞান তুলে নেবেন। অবশেষে যখন কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ অজ্ঞদের নেতা বানাবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হবে, আর তারা না জেনে ফতোয়া দেবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১০০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৭৩ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত
লোক দেখানো জ্ঞানের পরিণতি
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে জ্ঞান অর্জন করেছিল ও কুরআন পড়েছিল, যাতে মানুষ তাকে আলেম ও কারি বলে। তাকে বলা হবে, দুনিয়াতেই তোমাকে তা বলা হয়েছে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৫)। তাই জ্ঞান অর্জনের নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১৬:৪৩, ১৭:৩৬, ৪৯:৬ • সহিহ বুখারি: ১০০, ১১০ • সহিহ মুসলিম: ভূমিকা ৩ ও ৫, ১৯০৫, ২৬৭৩, ২৭২২ • ইবনু মাজাহ ৯২৫
Leave a Reply