সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার) মুমিন সমাজের বৈশিষ্ট্য এবং সমাজকে ধ্বংস থেকে রক্ষার রক্ষাকবচ। পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় অভিশপ্ত হয়েছিল। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ দায়িত্বের গুরুত্ব ও পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
- মুমিন নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য
- দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরিণতি
- নৌকার দৃষ্টান্ত
- দোয়া কবুল না হওয়ার সতর্কবাণী
- সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব
- দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা
- ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন
মুমিন নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ أُولَٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ
“আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদের ওপরই আল্লাহ রহম করবেন।”
সূরা আত-তাওবা ৯:৭১
দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরিণতি
كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ ۚ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
(বনি ইসরাইলের অভিশপ্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে:) “তারা যেসব অন্যায় কাজ করত, তা থেকে একে অপরকে নিষেধ করত না। তারা যা করত, তা কতই না নিকৃষ্ট!”
সূরা আল-মায়িদা ৫:৭৯ (আগের আয়াত ৫:৭৮ সহ)
নৌকার দৃষ্টান্ত
“আল্লাহর বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি এবং তা লঙ্ঘনকারীর দৃষ্টান্ত হলো এমন একদল লোকের মতো, যারা লটারির মাধ্যমে একটি নৌকায় জায়গা ভাগ করে নিল। কেউ ওপরের তলায় পেল, কেউ নিচের তলায়। নিচের তলার লোকদের পানি নিতে ওপরের লোকদের কাছ দিয়ে যেতে হতো। তারা বলল: আমরা যদি আমাদের অংশে একটি ছিদ্র করে নিই, তাহলে ওপরের লোকদের কষ্ট দিতে হবে না। এখন ওপরের লোকেরা যদি তাদের ইচ্ছামতো করতে দেয়, তবে সবাই ধ্বংস হবে। আর যদি তাদের হাত ধরে থামিয়ে দেয়, তবে তারাও বাঁচবে, সবাই বাঁচবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৯৩ — নুমান ইবনু বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত
এ দৃষ্টান্ত বোঝায়, সমাজের কিছু মানুষের অন্যায় সবার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সুন্দর পদ্ধতিতে অন্যায় প্রতিরোধ সবার স্বার্থে।
দোয়া কবুল না হওয়ার সতর্কবাণী
“যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। নইলে অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা তাঁকে ডাকবে, কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবেন না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ২১৬৯ (ইমাম তিরমিজি: হাসান) — হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত
সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব
“তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে। যদি তা-ও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে (ঘৃণা করে)। আর এটি ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৯ — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত
আলেমগণ এ দায়িত্ব পালনের কয়েকটি শর্ত বলেছেন: বিষয়টি নিশ্চিতভাবে অন্যায় হওয়া, নিষেধকারী সে বিষয়ে জ্ঞান রাখা, নম্র পদ্ধতি অবলম্বন করা, আর এতে যেন আরও বড় ফিতনা বা ক্ষতি সৃষ্টি না হয়। শক্তি প্রয়োগের দায়িত্ব মূলত তাদের, যাদের সে বৈধ কর্তৃত্ব আছে, যেমন অভিভাবক তার পরিবারে।
দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা
الدِّينُ النَّصِيحَةُ
“দ্বীন হলো নসিহত (কল্যাণকামিতা)।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য? তিনি বললেন: “আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলিমদের নেতাদের জন্য এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৫ — তামিম আদ-দারি (রা.) থেকে বর্ণিত
সৎকাজের আদেশের মূল প্রেরণা হওয়া উচিত মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতা, নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ বা কাউকে অপমান করা নয়।
ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
“হে আমার প্রিয় পুত্র, নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো, এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”
সূরা লুকমান ৩১:১৭
লুকমান (আ.) সৎকাজের আদেশের পরপরই ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছেন, কারণ এ পথে বাধা ও কষ্ট আসবেই।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৫:৭৮–৭৯, ৯:৭১, ৩১:১৭ • সহিহ বুখারি: ২৪৯৩ • সহিহ মুসলিম: ৪৯, ৫৫ • তিরমিজি ২১৬৯
Leave a Reply