দুনিয়া মুমিনের জন্য কর্মক্ষেত্র ও পরীক্ষার স্থান, চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। দুনিয়ার মোহ মানুষকে আখিরাত ভুলিয়ে দেয়, আর যুহদ (দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি) মানুষকে প্রকৃত সফলতার পথে রাখে। তবে যুহদ মানে হালাল উপভোগ ত্যাগ করা নয়, বরং দুনিয়াকে হাতে রাখা, হৃদয়ে নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
- দুনিয়ার প্রকৃত রূপ
- প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা
- আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া
- আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য
- মানুষের সীমাহীন লোভ
- নবীজির ﷺ আশঙ্কা
- স্থায়ী সম্পদ: নেক আমল
- যুহদের সঠিক অর্থ
দুনিয়ার প্রকৃত রূপ
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
“জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ, সাজসজ্জা, পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র।”
সূরা আল-হাদিদ ৫৭:২০ — আয়াতের বাকি অংশে দুনিয়াকে বৃষ্টিতে জন্মানো ফসলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা কিছুদিন পর হলুদ হয়ে খড়কুটায় পরিণত হয়।
প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের (আখিরাত থেকে) উদাসীন করে রেখেছে, এমনকি তোমরা কবরে পৌঁছে গেছ।”
সূরা আত-তাকাসুর ১০২:১–২
আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া
“আল্লাহর কসম, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া এমন, যেমন তোমাদের কেউ তার এই আঙুলটি (শাহাদাত আঙুল) সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। তারপর দেখুক, আঙুল কতটুকু পানি নিয়ে ফেরে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৫৮ — মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ (রা.) থেকে বর্ণিত
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার, আর কাফিরের জন্য জান্নাত।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৫৬ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
অর্থাৎ মুমিন আখিরাতে যে নিয়ামত পাবে, তার তুলনায় দুনিয়া কারাগারের মতো। আর কাফির আখিরাতে যে শাস্তি পাবে, তার তুলনায় দুনিয়া তার জন্য জান্নাতের মতো।
আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য
“আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য যদি একটি মশার ডানার সমানও হতো, তবে তিনি কোনো কাফিরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ২৩২০ (শাইখ আলবানি: সহিহ) — সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত
মানুষের সীমাহীন লোভ
“আদম সন্তানের যদি এক উপত্যকা ভর্তি সোনা থাকে, তবে সে চাইবে তার আরও দুটি উপত্যকা হোক। মাটি ছাড়া আর কিছুই তার মুখ ভরতে পারবে না (মৃত্যু ছাড়া তার লোভ শেষ হবে না)। আর যে তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৩৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৪৮ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
নবীজির ﷺ আশঙ্কা
“আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি, তোমাদের সামনে দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের সামনে করা হয়েছিল। তখন তোমরা তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে, যেমন তারা করেছিল। আর তা তোমাদের ধ্বংস করে দেবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩১৫৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৬১ — আমর ইবনু আওফ (রা.) থেকে বর্ণিত
স্থায়ী সম্পদ: নেক আমল
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا
“ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য। আর স্থায়ী নেক আমলগুলো তোমার রবের কাছে প্রতিদান হিসেবে উত্তম এবং আশার দিক থেকেও উত্তম।”
সূরা আল-কাহফ ১৮:৪৬
যুহদের সঠিক অর্থ
যুহদ মানে বৈরাগ্য বা হালাল নিয়ামত ত্যাগ করা নয়। নবীজি ﷺ বিয়ে করেছেন, রোজা রেখেছেন আবার ছেড়েছেন, রাতে নামাজও পড়েছেন আবার ঘুমিয়েছেন, এবং বলেছেন: যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয় (সহিহ বুখারি ৫০৬৩)। প্রকৃত যুহদ হলো দুনিয়াকে হাতে রাখা, হৃদয়ে নয়। হালাল উপার্জন করা, কিন্তু তার জন্য দ্বীন বিক্রি না করা। দুনিয়া পেলে কৃতজ্ঞ থাকা, হারালে ভেঙে না পড়া।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১৮:৪৬, ৫৭:২০, ১০২:১–২ • সহিহ বুখারি: ৩১৫৮, ৫০৬৩, ৬৪৩৯ • সহিহ মুসলিম: ১০৪৮, ২৮৫৮, ২৯৫৬, ২৯৬১ • তিরমিজি ২৩২০
Leave a Reply