কিয়ামতের দিন মানুষের আমল ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লায় (মিজান) ওজন করা হবে। এরপর জাহান্নামের ওপর স্থাপিত পুলসিরাত পার হতে হবে। আর সেদিন এমন “দেউলিয়া” দেখা যাবে, যে প্রচুর নেক আমল নিয়ে এসেও মানুষের হক নষ্ট করার কারণে সব হারিয়ে ফেলবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
- ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা
- যার পাল্লা ভারী, যার পাল্লা হালকা
- যেসব আমল পাল্লা ভারী করে
- পুলসিরাত
- আমল অনুযায়ী পার হওয়া
- প্রকৃত দেউলিয়া কে
ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ
“আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি সামান্যতম জুলুমও করা হবে না। যদি সরিষার দানা পরিমাণ (আমল)ও থাকে, আমি তা উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আমিই যথেষ্ট।”
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭
যার পাল্লা ভারী, যার পাল্লা হালকা
فَأَمَّا مَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَّاضِيَةٍ وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ
“অতঃপর যার (নেকির) পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার ঠিকানা হবে ‘হাবিয়া’ (জাহান্নাম)।”
সূরা আল-কারিআ ১০১:৬–৯
যেসব আমল পাল্লা ভারী করে
وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلَأُ الْمِيزَانَ
“…আর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মিজানের পাল্লা পূর্ণ করে দেয়।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৩ — আবু মালিক আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত
“দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, মিজানের পাল্লায় ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রিয়: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
“কিয়ামতের দিন মুমিনের মিজানের পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কিছুই হবে না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ২০০২ (হাসান সহিহ) — আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত
পুলসিরাত
وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوا وَّنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
“আর তোমাদের প্রত্যেককেই তা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে। এটি তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। তারপর আমি মুত্তাকিদের রক্ষা করব, আর জালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।”
সূরা মারইয়াম ১৯:৭১–৭২ — অনেক মুফাসসিরের মতে, এখানে পুলসিরাত পার হওয়া উদ্দেশ্য।
“…আর জাহান্নামের ওপর সেতু (পুলসিরাত) স্থাপন করা হবে। রাসুলদের মধ্যে আমিই প্রথম আমার উম্মতকে নিয়ে তা পার হব। সেদিন রাসুলগণ ছাড়া কেউ কথা বলবে না, আর রাসুলদের কথা হবে: হে আল্লাহ, নিরাপদ রাখুন, নিরাপদ রাখুন। জাহান্নামে (সেতুর ওপর) সাদান গাছের কাঁটার মতো আঁকড়া থাকবে… সেগুলো মানুষকে তাদের আমল অনুযায়ী আঁকড়ে ধরবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৮০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
আমল অনুযায়ী পার হওয়া
অন্য হাদিসে এসেছে, আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে পাঠানো হবে, আর তারা পুলসিরাতের ডানে ও বামে দাঁড়িয়ে থাকবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী পার হবে: কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ পাখির মতো, কেউ দ্রুতগামী মানুষের দৌড়ের মতো। আর নবীজি ﷺ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে বলতে থাকবেন: হে আমার রব, নিরাপদ রাখুন, নিরাপদ রাখুন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৫)।
প্রকৃত দেউলিয়া কে
নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: “তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?” সাহাবিরা বললেন, আমাদের মধ্যে দেউলিয়া সে, যার কোনো দিরহাম বা সম্পদ নেই। তিনি বললেন: “আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত ঝরিয়েছে, কাউকে মেরেছে। তখন তার নেকিগুলো থেকে এদের একেকজনকে দেওয়া হবে। পাওনা পরিশোধের আগেই তার নেকি শেষ হয়ে গেলে, তাদের গুনাহ নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১৯:৭১–৭২, ২১:৪৭, ১০১:৬–৯ • সহিহ বুখারি: ৮০৬, ৬৪০৬ • সহিহ মুসলিম: ১৮২, ১৯৫, ২২৩, ২৫৮১, ২৬৯৪ • তিরমিজি ২০০২
Leave a Reply