উসমান ইবনু আফফান (রা.) ও আলি ইবনু আবি তালিব (রা.) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা। উসমান (রা.) লজ্জাশীলতা ও দানশীলতার জন্য, আর আলি (রা.) বীরত্ব, জ্ঞান ও নবীজির ﷺ সঙ্গে নিকটতম আত্মীয়তার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সহিহ হাদিসের আলোকে এ দুই মহান সাহাবির মর্যাদা তুলে ধরা হলো।
- উসমান (রা.): ফেরেশতারাও যাঁকে লজ্জা করেন
- উসমান (রা.): তাবুক অভিযানে দান
- উসমান (রা.): জান্নাতের সুসংবাদ
- উসমান (রা.): কুরআনের একক মুসহাফ
- আলি (রা.): মুসার কাছে হারুনের মতো
- আলি (রা.): আল্লাহ ও রাসুলের প্রিয়
- আলি (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা
উসমান (রা.): ফেরেশতারাও যাঁকে লজ্জা করেন
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ শুয়ে ছিলেন। আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এলে তিনি সেভাবেই কথা বললেন। কিন্তু উসমান (রা.) অনুমতি চাইলে তিনি উঠে বসলেন এবং কাপড় ঠিক করে নিলেন। পরে কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বললেন: “আমি কি এমন ব্যক্তিকে লজ্জা করব না, যাঁকে ফেরেশতারাও লজ্জা করেন?”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪০১ (সংক্ষেপিত)
নবীজির ﷺ দুই কন্যা, রুকাইয়া (রা.) ও উম্মু কুলসুম (রা.), পরপর তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে “যুন-নুরাইন” (দুই নূরের অধিকারী) বলা হয়। রুকাইয়া (রা.)-এর অসুস্থতার কারণে তিনি বদরে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তবু নবীজি ﷺ তাঁকে বদরের অংশগ্রহণকারীদের সমান সওয়াব ও অংশের সুসংবাদ দিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬৯৮)।
উসমান (রা.): তাবুক অভিযানে দান
তাবুক অভিযানের কষ্টকর বাহিনী প্রস্তুতের সময় উসমান (রা.) এক হাজার দিনার এনে নবীজির ﷺ কোলে ঢেলে দিলেন। নবীজি ﷺ বললেন: “আজকের পর উসমান যা-ই করুক, তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৭০১ (হাসান) — আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত
উসমান (রা.): জান্নাতের সুসংবাদ
আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) একটি বাগানের দরজায় পাহারায় ছিলেন। একে একে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এলে নবীজি ﷺ তাঁদের জান্নাতের সুসংবাদ দিতে বললেন। এরপর উসমান (রা.) এলে নবীজি ﷺ বললেন: “তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও, সঙ্গে একটি বিপদের কথাও জানাও, যা তার ওপর আসবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪০৩ (সংক্ষেপিত)
পরবর্তীতে খিলাফতের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের হাতে তিনি নিজ ঘরে অবরুদ্ধ অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
উসমান (রা.): কুরআনের একক মুসহাফ
বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন তিলাওয়াতের পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা দেখা দিলে হুযাইফা (রা.)-এর পরামর্শে উসমান (রা.) আবু বকর (রা.)-এর যুগে সংকলিত মূল কপি থেকে একক মানসম্মত মুসহাফ তৈরি করিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৮৭)। আজ পৃথিবীজুড়ে আমরা যে মুসহাফ পড়ি, তা এ ঐতিহাসিক কাজেরই ধারাবাহিকতা।
আলি (রা.): মুসার কাছে হারুনের মতো
তাবুক অভিযানে যাওয়ার সময় নবীজি ﷺ আলি (রা.)-কে মদিনায় রেখে গেলেন। আলি (রা.) বললেন, আপনি কি আমাকে নারী ও শিশুদের মধ্যে রেখে যাচ্ছেন? নবীজি ﷺ বললেন: “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি আমার কাছে তেমন, যেমন মুসার কাছে হারুন ছিলেন? তবে আমার পরে কোনো নবী নেই।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৪১৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪০৪ — সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত
আলি (রা.): আল্লাহ ও রাসুলের প্রিয়
খায়বারের দিন নবীজি ﷺ বললেন: “আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দেবেন। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলও তাকে ভালোবাসেন।” পরদিন তিনি আলি (রা.)-কে ডেকে পতাকা দিলেন এবং বললেন: “আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে আল্লাহ যদি একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩০০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪০৬ — সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
আলি (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা
আলি (রা.) বলেন: “যিনি বীজ থেকে চারা উদ্গত করেন এবং প্রাণ সৃষ্টি করেন, তাঁর কসম! উম্মি নবী ﷺ আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, মুমিন ছাড়া কেউ আমাকে ভালোবাসবে না, আর মুনাফিক ছাড়া কেউ আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৮
📚 তথ্যসূত্র
সহিহ বুখারি: ৩০০৯, ৩৬৯৫, ৩৬৯৮, ৪৪১৬, ৪৯৮৭ • সহিহ মুসলিম: ৭৮, ২৪০১, ২৪০৩, ২৪০৪, ২৪০৬ • তিরমিজি ৩৭০১
Leave a Reply