☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

পরিবারে দাওয়াত: নবীদের দৃষ্টান্ত

দাওয়াতের প্রথম ও সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিজের পরিবারের প্রতি। কুরআনে নবীদের যে দাওয়াতি কাহিনি এসেছে, তার অনেকগুলোই পরিবারকেন্দ্রিক: ইবরাহিম (আ.) তাঁর বাবাকে, নুহ (আ.) তাঁর ছেলেকে, ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের এবং লুকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে দাওয়াত দিয়েছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে পরিবারে দাওয়াতের পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করো
  2. ইবরাহিম (আ.): বাবার প্রতি কোমল দাওয়াত
  3. নুহ (আ.): শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছেলেকে আহ্বান
  4. ইয়াকুব (আ.): মৃত্যুশয্যায় সন্তানদের প্রশ্ন
  5. নবীজি ﷺ: চাচার জন্য ব্যাকুলতা
  6. আবু হুরায়রা (রা.): মায়ের জন্য দোয়া
  7. পরিবারে দাওয়াতের পদ্ধতি

নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করো

কুরআন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।”

সূরা আত-তাহরিম ৬৬:৬

ইবরাহিম (আ.): বাবার প্রতি কোমল দাওয়াত

কুরআন

يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا

“হে আমার বাবা, আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসেনি। সুতরাং আপনি আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সরল পথ দেখাব।”

সূরা মারইয়াম ১৯:৪৩

লক্ষণীয়, প্রতিটি বাক্য তিনি শুরু করেছেন “ইয়া আবাতি” (হে আমার প্রিয় বাবা) বলে (১৯:৪২–৪৫)। বাবা কঠোর হুমকি দেওয়ার পরও তিনি বললেন:

কুরআন

سَلَامٌ عَلَيْكَ ۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي

“আপনার প্রতি সালাম। আমি আমার রবের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।”

সূরা মারইয়াম ১৯:৪৭

নুহ (আ.): শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছেলেকে আহ্বান

কুরআন

يَا بُنَيَّ ارْكَب مَّعَنَا وَلَا تَكُن مَّعَ الْكَافِرِينَ

মহাপ্লাবনের ঢেউয়ের মধ্যেও নুহ (আ.) ছেলেকে ডেকে বললেন: “হে আমার প্রিয় পুত্র, আমাদের সঙ্গে (নৌকায়) আরোহণ করো, আর কাফিরদের সঙ্গে থেকো না।”

সূরা হুদ ১১:৪২

এ ঘটনা শেখায়, হিদায়াত আল্লাহর হাতে। নবীর ছেলেও পথভ্রষ্ট হতে পারে। তবু দাওয়াতকারীর দায়িত্ব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মমতার সঙ্গে ডেকে যাওয়া।

ইয়াকুব (আ.): মৃত্যুশয্যায় সন্তানদের প্রশ্ন

কুরআন

إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي

“যখন (মৃত্যুর সময়) তিনি তাঁর সন্তানদের জিজ্ঞেস করলেন: আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে?”

সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩

জীবনের শেষ মুহূর্তে একজন নবীর সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল সন্তানদের সম্পদ নয়, তাদের ঈমান।

নবীজি ﷺ: চাচার জন্য ব্যাকুলতা

নবীজির ﷺ চাচা আবু তালিব আজীবন তাঁকে রক্ষা করেছেন। মৃত্যুর সময় নবীজি ﷺ বারবার তাঁকে বললেন: হে চাচা, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলুন, যাতে আল্লাহর কাছে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারি। কিন্তু তিনি তা বলেননি। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন: “আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন” (২৮:৫৬; সহিহ বুখারি ৩৮৮৪; সহিহ মুসলিম ২৪)।

আবু হুরায়রা (রা.): মায়ের জন্য দোয়া

হাদিস

আবু হুরায়রা (রা.) মাকে দাওয়াত দিতেন, কিন্তু তিনি গ্রহণ করতেন না। একদিন কাঁদতে কাঁদতে নবীজির ﷺ কাছে এসে মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দিন।” ঘরে ফিরে তিনি দেখলেন, মা কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৯১ (সংক্ষেপিত)

পরিবারে দাওয়াতের পদ্ধতি

  • সম্মান ও মমতা: বাবা-মা বা বড়দের সঙ্গে ইবরাহিম (আ.)-এর মতো সম্মানসূচক সম্বোধন ও নম্র ভাষা।
  • নিজের আমল: পরিবার উপদেশের চেয়ে আচরণ দেখে বেশি প্রভাবিত হয়। নামাজি, সত্যবাদী ও সেবাপরায়ণ সন্তানই সবচেয়ে বড় দাওয়াত।
  • ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা: নবীজি ﷺ পরিবারকে নামাজের আদেশ দিতে এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকতে আদিষ্ট হয়েছিলেন (২০:১৩২)।
  • দোয়া: হিদায়াতের মালিক আল্লাহ। তাই প্রতিদিন পরিবারের হিদায়াতের জন্য দোয়া করা।
  • জবরদস্তি ও অপমান নয়: সম্পর্ক ছিন্ন না করে, তর্কে না জড়িয়ে, সুন্দর আচরণ বজায় রেখে দাওয়াত চালিয়ে যাওয়া।
প্রতিদিনের দোয়া: “রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ” (হে আমার রব, আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ কায়েমকারী বানান; হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করুন) — সূরা ইবরাহিম ১৪:৪০।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২:১৩৩, ১১:৪২, ১৪:৪০, ১৯:৪২–৪৭, ২০:১৩২, ২৮:৫৬, ৬৬:৬ • সহিহ বুখারি: ৩৮৮৪ • সহিহ মুসলিম: ২৪, ২৪৯১

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *