প্রশ্ন করা জ্ঞান অর্জনের চাবি। তবে ইসলাম প্রশ্ন করারও আদব শিখিয়েছে: প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশ্ন করা, অনর্থক ও কঠিন বানানো প্রশ্ন এড়িয়ে চলা, সঠিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা এবং সময়-সুযোগ বুঝে প্রশ্ন করা। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে প্রশ্ন করার আদব তুলে ধরা হলো।
- না জানলে জিজ্ঞেস করো
- অজ্ঞতার চিকিৎসা প্রশ্ন
- অনর্থক প্রশ্নের নিষেধাজ্ঞা
- অতিরিক্ত প্রশ্ন পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে
- প্রশ্নের কারণে বিধান কঠিন হওয়া
- প্রশ্নকারীর আদব: কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
- জিবরিল (আ.)-এর প্রশ্নের আদব
না জানলে জিজ্ঞেস করো
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।”
সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩
অজ্ঞতার চিকিৎসা প্রশ্ন
জাবির (রা.) বলেন, এক সফরে আমাদের একজনের মাথায় পাথরের আঘাতে ক্ষত হয়েছিল। এরপর তার স্বপ্নদোষ হলো। সে সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করল, আমার কি তায়াম্মুমের অনুমতি আছে? তারা বলল, তুমি পানি ব্যবহার করতে পারো, তাই অনুমতি নেই। সে গোসল করল এবং মারা গেল। নবীজি ﷺ ঘটনা শুনে বললেন: “তারা তাকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! তারা যখন জানত না, তখন জিজ্ঞেস করল না কেন? অজ্ঞতার চিকিৎসা তো প্রশ্ন করা।”
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৬ (শাইখ আলবানি: হাসান, শেষাংশ ছাড়া) (সংক্ষেপিত)
এ ঘটনা শেখায়, না জেনে ফতোয়া দেওয়া কত মারাত্মক, আর না জানলে বিজ্ঞজনকে জিজ্ঞেস করা কত জরুরি।
অনর্থক প্রশ্নের নিষেধাজ্ঞা
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমরা এমন বিষয়ে প্রশ্ন কোরো না, যা প্রকাশ করা হলে তোমাদের কাছে খারাপ লাগবে।”
সূরা আল-মায়িদা ৫:১০১
অতিরিক্ত প্রশ্ন পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে
নবীজি ﷺ হজ ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণা করলে এক ব্যক্তি তিনবার জিজ্ঞেস করল, প্রতি বছর কি? নবীজি ﷺ বললেন: “আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে তা (প্রতি বছর) ফরজ হয়ে যেত, আর তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হতে না।” তারপর বললেন: “আমি যতক্ষণ তোমাদের (কোনো বিষয়ে) ছেড়ে রাখি, তোমরাও আমাকে ছেড়ে দাও। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং নবীদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ধ্বংস হয়েছিল। আমি যখন তোমাদের কোনো কিছুর আদেশ দিই, সাধ্যমতো তা পালন করো, আর যখন কোনো কিছু থেকে নিষেধ করি, তা বর্জন করো।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৩৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
প্রশ্নের কারণে বিধান কঠিন হওয়া
“মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী সেই ব্যক্তি, যে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করেছে যা হারাম ছিল না, অথচ তার প্রশ্নের কারণেই তা হারাম করা হয়েছে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৭২৮৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৫৮ — সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত
আলেমগণ বলেছেন, এ বিধান মূলত ওহি নাজিলের যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এর শিক্ষা চিরন্তন: দ্বীনকে অহেতুক জটিল করে তোলার মতো প্রশ্ন ও বিতর্ক এড়িয়ে চলা।
প্রশ্নকারীর আদব: কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
নবীজি ﷺ এক মজলিসে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক বেদুইন এসে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? নবীজি ﷺ কথা চালিয়ে গেলেন। কথা শেষ করে বললেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” সে বলল, এই যে আমি। তিনি বললেন: “যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
ইমাম বুখারি (রহ.) এ হাদিস এনেছেন “যে ব্যক্তি নিজের কথায় ব্যস্ত অবস্থায় প্রশ্ন শুনে, কথা শেষ করে উত্তর দেয়” অধ্যায়ে। এতে শিক্ষক ও প্রশ্নকারী উভয়ের জন্য আদব রয়েছে।
জিবরিল (আ.)-এর প্রশ্নের আদব
হাদিসে জিবরিলে দেখা যায়, জিবরিল (আ.) মানুষের রূপে এসে নবীজির ﷺ কাছে এমনভাবে বসলেন যে নিজের হাঁটু তাঁর হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তারপর ক্রমানুসারে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামত সম্পর্কে স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করলেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮)। আলেমগণ এ থেকে শিখেছেন: পরিচ্ছন্ন পোশাকে শিক্ষকের কাছে আসা, কাছে বসা, মৌলিক বিষয় দিয়ে শুরু করা এবং স্পষ্টভাবে প্রশ্ন করা।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৫:১০১, ১৬:৪৩ • সহিহ বুখারি: ৫৯, ৭২৮৯ • সহিহ মুসলিম: ৮, ১৩৩৭, ২৩৫৮ • আবু দাউদ ৩৩৬
Leave a Reply