মুসআব ইবনু উমাইর (রা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সচ্ছল ও সুদর্শন যুবকদের একজন। ইসলাম গ্রহণের পর সেই বিলাসী জীবন ত্যাগ করে তিনি হয়ে ওঠেন ইসলামের প্রথম দূত, যাঁর মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। আর উহুদের ময়দানে শহিদ হওয়ার পর তাঁর কাফনের জন্য একটি পূর্ণ চাদরও পাওয়া যায়নি। সহিহ হাদিসের আলোকে তাঁর জীবন তুলে ধরা হলো।
- মদিনায় ইসলামের প্রথম দূত
- উহুদের ময়দানে শাহাদাত
- একটি চাদরের কাফন
- আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)-এর কান্না
- যাঁরা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন
- মুসআব (রা.)-এর জীবনের শিক্ষা
মদিনায় ইসলামের প্রথম দূত
বারা ইবনু আযিব (রা.) বলেন: “নবীজির ﷺ সাহাবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাদের (মদিনায়) এসেছিলেন মুসআব ইবনু উমাইর ও ইবনু উম্মি মাকতুম (রা.)। তাঁরা মানুষকে কুরআন পড়াতেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯২৫ (সংক্ষেপিত)
সিরাত গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে, প্রথম আকাবার বাইআতের পর নবীজি ﷺ মদিনাবাসীদের কুরআন ও দ্বীন শেখানোর জন্য মুসআব (রা.)-কে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতে মদিনার বহু পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে হিজরতের পথ সুগম করে।
উহুদের ময়দানে শাহাদাত
সিরাত গ্রন্থসমূহ অনুযায়ী, উহুদের যুদ্ধে মুসআব (রা.) মুসলিমদের পতাকাবাহী ছিলেন এবং সেদিনই শাহাদাত বরণ করেন। নিচের সহিহ হাদিসগুলোতে তাঁর শাহাদাতের পরের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।
একটি চাদরের কাফন
খাব্বাব (রা.) বলেন, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নবীজির ﷺ সঙ্গে হিজরত করেছিলাম, তাই আমাদের প্রতিদান আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমাদের কেউ কেউ এমন অবস্থায় চলে গেছেন যে, (দুনিয়ায়) তাঁর প্রতিদানের কিছুই ভোগ করেননি। তাঁদের একজন মুসআব ইবনু উমাইর (রা.)। উহুদের দিন তিনি শহিদ হলেন। তাঁর কাফনের জন্য আমরা শুধু একটি চাদর পেলাম। তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যেত। তখন নবীজি ﷺ আমাদের নির্দেশ দিলেন, মাথা ঢেকে দাও এবং পায়ের ওপর ইযখির ঘাস দিয়ে দাও।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৪০ (সংক্ষেপিত)
যে যুবক একসময় মক্কার সবচেয়ে দামি পোশাক পরতেন, আল্লাহর পথে তাঁর শেষ পোশাক ছিল একটি অপূর্ণ চাদর।
আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)-এর কান্না
একদিন আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)-এর সামনে রোজার ইফতারের খাবার আনা হলো। তিনি বললেন: মুসআব ইবনু উমাইর শহিদ হয়েছেন, আর তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তাঁকে এমন একটি চাদরে কাফন দেওয়া হয়েছিল যে, মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যেত… তারপর আমাদের জন্য দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছে। আমার ভয় হয়, আমাদের নেকির প্রতিদান হয়তো দুনিয়াতেই আগাম দিয়ে দেওয়া হলো। এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং খাবার রেখে দিলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৭৪ (সংক্ষেপিত)
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত একজন সাহাবির এ বিনয় ও আল্লাহভীতি আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষা।
যাঁরা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন
مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ ۖ فَمِنْهُم مَّن قَضَىٰ نَحْبَهُ وَمِنْهُم مَّن يَنتَظِرُ ۖ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا
“মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কেউ কেউ নিজের দায়িত্ব পূর্ণ করে (শাহাদাত বরণ করে) চলে গেছে, আর কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:২৩ — উহুদের শহিদদের প্রসঙ্গে বর্ণিত আয়াত (সহিহ বুখারি ২৮০৫)
মুসআব (রা.)-এর জীবনের শিক্ষা
- আল্লাহর জন্য বিলাসিতা ত্যাগ: সচ্ছল পরিবারের আরাম ছেড়ে তিনি দ্বীনকে বেছে নিয়েছিলেন।
- কুরআনভিত্তিক দাওয়াত: মদিনায় তাঁর প্রধান কাজ ছিল মানুষকে কুরআন শেখানো।
- দুনিয়ার প্রতিদান নয়, আখিরাত: তিনি দুনিয়ার কোনো সুফল ভোগ না করেই চলে গেছেন, তাঁর পুরো প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩৩:২৩ • সহিহ বুখারি: ৬৬০, ১২৭৪, ১২৭৬, ২৮০৫, ৩৯২৫ • সহিহ মুসলিম: ৯৪০
Leave a Reply