দাওয়াতের উদ্দেশ্য মানুষের হৃদয় জয় করা, তর্কে জেতা নয়। তাই কুরআন দাওয়াতের পদ্ধতিও শিখিয়ে দিয়েছে: হিকমত, সুন্দর উপদেশ, নম্রতা, সহজীকরণ এবং নিজের আমলের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে দাওয়াতের নববি পদ্ধতি ও আদব তুলে ধরা হলো।
- হিকমত ও সুন্দর উপদেশ
- নম্রতা: নবীদের পদ্ধতি
- সহজ করো, কঠিন কোরো না
- পর্যায়ক্রমে দাওয়াত
- বিরক্তিকর না হওয়া
- নিজে আমল করা
- ফলাফল আল্লাহর হাতে
হিকমত ও সুন্দর উপদেশ
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“আপনার রবের পথে মানুষকে আহ্বান করুন হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে, এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন সর্বোত্তম পন্থায়।”
সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সঠিক পথ ভ্রান্ত পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৬)। দাওয়াতকারীর কাজ হলো সুন্দরভাবে সত্য তুলে ধরা।
নম্রতা: নবীদের পদ্ধতি
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
আল্লাহ মুসা ও হারুন (আ.)-কে ফিরআউনের কাছে পাঠানোর সময় বলেছিলেন: “তোমরা তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।”
সূরা ত্বাহা ২০:৪৪
পৃথিবীর সবচেয়ে অহংকারী শাসকের সঙ্গেও যদি নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশ থাকে, তবে একজন সাধারণ মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা সহজেই বোঝা যায়।
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯
“নম্রতা যে জিনিসে থাকে, তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর যে জিনিস থেকে নম্রতা সরিয়ে নেওয়া হয়, তাকে কুৎসিত করে দেয়।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯৪ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
সহজ করো, কঠিন কোরো না
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
“তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না। সুসংবাদ দাও, (মানুষকে) দূরে সরিয়ে দিয়ো না।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৩৪ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
এক বেদুইন মসজিদে পেশাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাকে থামাতে উদ্যত হলেন। নবীজি ﷺ বললেন: “তাকে ছেড়ে দাও, আর তার পেশাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদের পাঠানো হয়েছে সহজ করার জন্য, কঠিন করার জন্য নয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২২০ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
পর্যায়ক্রমে দাওয়াত
মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় নবীজি ﷺ বলেছিলেন, প্রথমে তাদের তাওহিদের সাক্ষ্যের দিকে ডাকবে। তারা তা মেনে নিলে জানাবে, আল্লাহ তাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। তারা তা মেনে নিলে জানাবে, আল্লাহ তাদের সম্পদে যাকাত ফরজ করেছেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত
এ হাদিস থেকে শিক্ষা হলো: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে শুরু করতে হবে, আর ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে। একসঙ্গে সব বিধান চাপিয়ে দেওয়া নববি পদ্ধতি নয়।
বিরক্তিকর না হওয়া
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ আমাদের বিরক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় কয়েক দিন বিরতি দিয়ে দিয়ে নসিহত করতেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮২১
নিজে আমল করা
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা নিজেরা করো না? আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় যে, তোমরা এমন কথা বলো যা নিজেরা করো না।”
সূরা আস-সাফ ৬১:২–৩
ফলাফল আল্লাহর হাতে
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ
“আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন।”
সূরা আল-কাসাস ২৮:৫৬
দাওয়াতকারীর দায়িত্ব শুধু সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়া। কেউ গ্রহণ না করলে হতাশ হওয়া বা রূঢ় আচরণ করা উচিত নয়। দোয়া চালিয়ে যেতে হবে, কারণ হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:২৫৬, ৩:১৫৯, ১৬:১২৫, ২০:৪৪, ২৮:৫৬, ৬১:২–৩ • সহিহ বুখারি: ৬৮, ৬৯, ২২০, ১৩৯৫ • সহিহ মুসলিম: ১৯, ১৭৩৪, ২৫৯৪, ২৮২১
Leave a Reply