অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে একটি সুন্দর আচরণ মানুষের হৃদয় বেশি জয় করে। ইয়ামামার নেতা সুমামা ইবনু উসাল (রা.) ছিলেন মুসলিমদের ঘোর শত্রু। অথচ বন্দি অবস্থায় নবীজির ﷺ উদার আচরণ দেখে মাত্র তিন দিনে তাঁর হৃদয় পুরোপুরি বদলে যায়। সহিহ হাদিসে বর্ণিত এ ঘটনা ও সুন্দর আচরণে দাওয়াতের শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করো
- সুমামা (রা.)-এর বন্দি হওয়া
- তিন দিনের কথোপকথন
- অপ্রত্যাশিত মুক্তি
- হৃদয়ের পরিবর্তন
- নতুন মুসলিমের দৃঢ়তা
- ঘটনার শিক্ষা
মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করো
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
“ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো সেই পন্থায়, যা সবচেয়ে উত্তম। তখন দেখবে, যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।”
সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪
এ আয়াতের বাস্তব দৃষ্টান্ত হলো সুমামা ইবনু উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৭২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৬৪)।
সুমামা (রা.)-এর বন্দি হওয়া
নবীজি ﷺ নজদের দিকে একটি অশ্বারোহী দল পাঠালেন। তারা বনু হানিফা গোত্রের সুমামা ইবনু উসাল নামের এক ব্যক্তিকে বন্দি করে নিয়ে এল। তিনি ছিলেন ইয়ামামাবাসীদের নেতা। সাহাবিরা তাঁকে মসজিদে নববির একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখলেন।
তিন দিনের কথোপকথন
নবীজি ﷺ তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: “হে সুমামা, তোমার কাছে কী আছে (তোমার কী ধারণা)?” তিনি বললেন: হে মুহাম্মাদ, আমার কাছে কল্যাণ আছে। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে এমন একজনকে হত্যা করবেন যার রক্তের দাবিদার আছে। আর যদি অনুগ্রহ করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবেন। আর যদি সম্পদ চান, তবে যত ইচ্ছা চাইতে পারেন।
নবীজি ﷺ তাঁকে সেভাবেই রেখে দিলেন। পরদিন এবং তার পরদিনও একই প্রশ্ন করলেন, আর সুমামা একই উত্তর দিলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৭২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৬৪ (সংক্ষেপিত)
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, মসজিদে বাঁধা থাকায় এই তিন দিন সুমামা মুসলিমদের নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও নবীজির ﷺ আচরণ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।
অপ্রত্যাশিত মুক্তি
তৃতীয় দিন নবীজি ﷺ বললেন: “সুমামাকে মুক্ত করে দাও।” কোনো শর্ত ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো। সুমামা মসজিদের কাছের একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করলেন। তারপর মসজিদে ফিরে এসে বললেন: “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৭২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৬৪
হৃদয়ের পরিবর্তন
সুমামা (রা.) বললেন: “হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম! পৃথিবীতে আপনার চেহারার চেয়ে অপছন্দনীয় কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না, অথচ এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর কসম! আপনার দ্বীনের চেয়ে অপছন্দনীয় কোনো দ্বীন আমার কাছে ছিল না, অথচ এখন আপনার দ্বীন আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর কসম! আপনার শহরের চেয়ে অপছন্দনীয় কোনো শহর আমার কাছে ছিল না, অথচ এখন আপনার শহর আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩৭২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৬৪
নতুন মুসলিমের দৃঢ়তা
এরপর সুমামা (রা.) উমরা করতে মক্কায় গেলেন। কুরাইশরা তাঁকে বলল, তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেছ? তিনি বললেন: না, বরং আমি মুহাম্মাদ ﷺ-এর সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম, নবীজি ﷺ অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ামামা থেকে তোমাদের কাছে গমের একটি দানাও আসবে না (সহিহ বুখারি ৪৩৭২)।
ঘটনার শিক্ষা
- আচরণই সবচেয়ে বড় দাওয়াত: নবীজি ﷺ সুমামাকে কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দেননি। মসজিদের পরিবেশ, মুসলিমদের আমল এবং উদার ব্যবহারই তাঁর হৃদয় বদলে দিয়েছে।
- জবরদস্তি নয়: শর্ত ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনি স্বাধীনভাবে, নিজের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” (২:২৫৬)।
- সময় দেওয়া: তিন দিন ধরে তাঁকে চিন্তা করার ও দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হিদায়াত আসতে সময় লাগতে পারে।
- শত্রু থেকে বন্ধু: ৪১:৩৪ আয়াতের প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ, যে ছিল সবচেয়ে বড় শত্রু, সে হয়ে গেল সবচেয়ে অনুগত।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:২৫৬, ৪১:৩৪ • সহিহ বুখারি: ৪৩৭২ • সহিহ মুসলিম: ১৭৬৪
Leave a Reply