চাকরি, পদ, দায়িত্ব ও সরকারি-বেসরকারি সম্পদ, সবই আমানত। কর্মস্থলে ফাঁকি দেওয়া, অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়া, অধীনস্থদের সঙ্গে প্রতারণা করা এবং “উপহারের” নামে ঘুষ নেওয়া আমানতের খেয়ানত। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে কর্মক্ষেত্রে আমানতদারির শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- আমানতের খেয়ানত কোরো না
- শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত কর্মী
- অযোগ্যের হাতে দায়িত্ব: কিয়ামতের আলামত
- পদ একটি আমানত
- অধীনস্থদের সঙ্গে প্রতারণা
- সরকারি কর্মকর্তার “উপহার”
- আত্মসাতের পরিণতি
- প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল
আমানতের খেয়ানত কোরো না
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না, এবং তোমাদের আমানতসমূহেরও খেয়ানত কোরো না।”
সূরা আল-আনফাল ৮:২৭
শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত কর্মী
إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
(মাদইয়ানের এক কন্যা মুসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর বাবাকে বলেছিলেন:) “নিশ্চয়ই আপনি যাদের কাজে নিয়োগ দেবেন, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে শক্তিশালী (যোগ্য) ও বিশ্বস্ত।”
সূরা আল-কাসাস ২৮:২৬
যোগ্যতা ও সততা, এ দুটিই একজন আদর্শ কর্মীর গুণ। শুধু দক্ষতা থাকলে অসততার আশঙ্কা থাকে, আর শুধু সততা থাকলে কাজ ঠিকমতো হয় না।
অযোগ্যের হাতে দায়িত্ব: কিয়ামতের আলামত
“যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন: “যখন দায়িত্ব অযোগ্য লোকের হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৯৬; অনুরূপ সহিহ বুখারি ৫৯ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
তাই সুপারিশ, আত্মীয়তা বা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যকে নিয়োগ দেওয়া আমানতের খেয়ানত।
পদ একটি আমানত
আবু যর (রা.) একটি দায়িত্বপূর্ণ পদ চাইলে নবীজি ﷺ তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন: “হে আবু যর, তুমি দুর্বল। আর এটি (পদ) একটি আমানত। কিয়ামতের দিন এটি লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে, তবে সেই ব্যক্তির জন্য নয়, যে যথাযথভাবে তা গ্রহণ করেছে এবং এর দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৫
অধীনস্থদের সঙ্গে প্রতারণা
“আল্লাহ যে বান্দাকে কোনো জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব দিয়েছেন, সে যদি তাদের সঙ্গে প্রতারণাকারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৭১৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪২ — মাকিল ইবনু ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত
সরকারি কর্মকর্তার “উপহার”
নবীজি ﷺ ইবনুল লুতবিয়্যা নামে এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব দিলেন। ফিরে এসে সে বলল: এগুলো আপনাদের (যাকাতের মাল), আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। নবীজি ﷺ মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন: “সে কেন তার বাবা বা মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখল না, তাকে কেউ উপহার দেয় কি না? যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! যে এভাবে কিছু নেবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজের ঘাড়ে বহন করে উপস্থিত হবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৩২ — আবু হুমাইদ আস-সাইদি (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
শিক্ষা: যে “উপহার” কেবল পদের কারণে আসে, তা প্রকৃতপক্ষে ঘুষেরই একটি রূপ।
আত্মসাতের পরিণতি
وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“আর যে ব্যক্তি (সামষ্টিক সম্পদ) আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে আত্মসাৎকৃত জিনিস নিয়ে উপস্থিত হবে।”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৬১
অফিসের জিনিসপত্র, সময়, যানবাহন বা অর্থ ব্যক্তিগত কাজে অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করাও আত্মসাতের পর্যায়ে পড়তে পারে।
প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে… কর্মচারী তার মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল, আর তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩:১৬১, ৮:২৭, ২৮:২৬ • সহিহ বুখারি: ৫৯, ৮৯৩, ২৫৯৭, ৬৪৯৬, ৭১৫০ • সহিহ মুসলিম: ১৪২, ১৮২৫, ১৮২৯, ১৮৩২
Leave a Reply