কিয়ামত কখন হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তবে নবীজি ﷺ এর কিছু আলামত জানিয়ে দিয়েছেন, যাতে মানুষ সতর্ক থাকে ও প্রস্তুতি নেয়। এ প্রবন্ধে শুধু কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত আলামতগুলো তুলে ধরা হলো। কোনো আলামতকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বর্তমান ঘটনার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হয়নি, কারণ তা ইলমের দাবি ছাড়া করা উচিত নয়।
- কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে
- নবীজির ﷺ আগমন নিজেই একটি আলামত
- হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত আলামত
- জ্ঞান উঠে যাওয়া ও গুনাহের বিস্তার
- আমানত নষ্ট হওয়া
- দশটি বড় আলামত
- পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়
- আসল প্রশ্ন: প্রস্তুতি কী?
কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে
يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ ۚ وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا
“লোকেরা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এর জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে। আর আপনি কী জানেন, হয়তো কিয়ামত নিকটেই।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৩
তাই কেউ যদি কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ বা বছর বলে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
নবীজির ﷺ আগমন নিজেই একটি আলামত
“আমি ও কিয়ামত এভাবে প্রেরিত হয়েছি।” এ কথা বলে তিনি শাহাদাত আঙুল ও মধ্যমা আঙুল একত্র করে দেখালেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৫১ — সাহল ইবনু সাদ ও আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
কুরআনেও বলা হয়েছে, কিয়ামতের আলামতগুলো তো এসেই গেছে (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৮)।
হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত আলামত
জিবরিল (আ.) কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবীজি ﷺ বললেন: “এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।” জিবরিল (আ.) বললেন, তাহলে এর আলামত সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: “দাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে, এবং তুমি দেখবে খালি পা, বস্ত্রহীন, নিঃস্ব ছাগলের রাখালরা উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করছে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮ — উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
জ্ঞান উঠে যাওয়া ও গুনাহের বিস্তার
“কিয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে: জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে, অজ্ঞতা বিস্তার লাভ করবে, মদপান ব্যাপক হবে এবং ব্যভিচার প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়বে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৮০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৭১ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
আমানত নষ্ট হওয়া
“যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন: “যখন দায়িত্ব অযোগ্য লোকের হাতে অর্পণ করা হবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৯৬ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
দশটি বড় আলামত
হুযাইফা ইবনু আসিদ (রা.) বলেন, আমরা কিয়ামত নিয়ে আলোচনা করছিলাম। নবীজি ﷺ বললেন: “দশটি আলামত না দেখা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না।” এরপর তিনি উল্লেখ করলেন:
- ধোঁয়া (দুখান),
- দাজ্জাল,
- বিশেষ এক প্রাণী (দাব্বাতুল আরদ),
- পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়,
- ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.)-এর অবতরণ,
- ইয়াজুজ ও মাজুজ,
- পূর্বে ভূমিধস,
- পশ্চিমে ভূমিধস,
- আরব উপদ্বীপে ভূমিধস,
- এবং সবশেষে ইয়েমেন থেকে বের হওয়া এক আগুন, যা মানুষকে তাদের সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯০১
ঈসা (আ.)-এর অবতরণ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই তিনি কিয়ামতের একটি নিদর্শন” (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৬১)। আর দাজ্জালের ফিতনা থেকে নবীজি ﷺ প্রতিটি নামাজের শেষ তাশাহহুদে আশ্রয় চাইতে বলেছেন (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)।
পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়
“পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে এবং মানুষ তা দেখবে, তখন সবাই ঈমান আনবে। কিন্তু সেটি হবে সেই সময়, যখন কারও ঈমান তার উপকারে আসবে না, যদি সে আগে ঈমান না এনে থাকে…” (৬:১৫৮)।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৬৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
অর্থাৎ তাওবার দরজা তখন বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাওবা ও নেক আমলে বিলম্ব করা উচিত নয়।
আসল প্রশ্ন: প্রস্তুতি কী?
এক ব্যক্তি নবীজিকে ﷺ জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন: “তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” লোকটি বলল, আমি খুব বেশি নামাজ, রোজা বা সদকার প্রস্তুতি নিইনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি। নবীজি ﷺ বললেন: “তুমি তার সঙ্গেই থাকবে, যাকে তুমি ভালোবাসো।” আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর এ কথায় আমরা যত আনন্দিত হয়েছিলাম, আর কিছুতে এত আনন্দিত হইনি।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৬৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৩৯ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৬:১৫৮, ৩৩:৬৩, ৪৩:৬১, ৪৭:১৮ • সহিহ বুখারি: ৮০, ৪৬৩৫, ৬১৬৭, ৬৪৯৬, ৬৫০৪ • সহিহ মুসলিম: ৮, ১৫৭, ৫৮৮, ২৬৩৯, ২৬৭১, ২৯০১, ২৯৫১
Leave a Reply