হজ জীবনের সবচেয়ে বড় সফরগুলোর একটি। এর সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে সফরের আগের প্রস্তুতির ওপর: নিয়তের বিশুদ্ধতা, হালাল অর্থ, পাওনা ও ঋণ পরিশোধ, ওসিয়ত, প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং সফরের আদব। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে হজের প্রস্তুতি ও সফরের আদব তুলে ধরা হলো।
- সর্বোত্তম পাথেয়: তাকওয়া
- হালাল অর্থে হজ
- ওসিয়ত লিখে রাখা
- হজের সময় চরিত্রের সংযম
- সফরের দোয়া
- সফরে আমির নির্বাচন
- কাজ শেষে দ্রুত ফেরা
- অক্ষম বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হজ
- নারীদের জন্য শ্রেষ্ঠ জিহাদ
সর্বোত্তম পাথেয়: তাকওয়া
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَىٰ ۚ وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
“আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া। আর হে বুদ্ধিমানেরা, তোমরা আমাকে ভয় করো।”
সূরা আল-বাকারা ২:১৯৭
আয়াতটি দুই ধরনের পাথেয়ের কথা বলছে: সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সামগ্রী, যাতে মানুষের কাছে হাত পাততে না হয়, এবং আখিরাতের জন্য তাকওয়ার পাথেয়, যা সবচেয়ে উত্তম।
হালাল অর্থে হজ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” এরপর নবীজি ﷺ এমন এক মুসাফিরের কথা বললেন, যে দীর্ঘ সফর করে, এলোমেলো চুল ও ধুলোমলিন শরীর নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করে। অথচ তার খাবার, পানীয় ও পোশাক হারাম। তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
ওসিয়ত লিখে রাখা
“কোনো মুসলিমের যদি ওসিয়ত করার মতো কিছু থাকে, তবে তার জন্য উচিত নয় যে, ওসিয়ত লিখে না রেখে সে দুই রাতও কাটায়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৭ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
তাই হজে যাওয়ার আগে ঋণ, আমানত ও মানুষের পাওনা লিখে রাখুন বা পরিশোধ করুন। কারও সঙ্গে মনোমালিন্য থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিন।
হজের সময় চরিত্রের সংযম
فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ
“হজের মধ্যে কোনো অশ্লীলতা নেই, কোনো পাপাচার নেই এবং কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই।”
সূরা আল-বাকারা ২:১৯৭
লাখো মানুষের ভিড়, গরম ও ক্লান্তির মধ্যে ধৈর্য ধরা হজের বড় পরীক্ষা। যে এসব থেকে বেঁচে হজ করে, সে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফেরে (সহিহ বুখারি ১৫২১; সহিহ মুসলিম ১৩৫০)।
সফরের দোয়া
اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ، اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى
“আল্লাহ সবচেয়ে বড় (তিনবার)। পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি এটিকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের কাছে ফিরে যাব। হে আল্লাহ, আমরা আমাদের এই সফরে আপনার কাছে কল্যাণ ও তাকওয়া এবং আপনার পছন্দনীয় আমল প্রার্থনা করছি।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪২ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত (প্রথম অংশ); আয়াতাংশ সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:১৩–১৪
সফরে আমির নির্বাচন
“তিনজন যখন সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের একজনকে আমির (দলনেতা) বানিয়ে নেয়।”
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৬০৮ (শাইখ আলবানি: হাসান সহিহ) — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত
কাজ শেষে দ্রুত ফেরা
“সফর শাস্তির একটি অংশ। এটি তোমাদের খাওয়া, পান করা ও ঘুমে বাধা দেয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন তার প্রয়োজন পূরণ করে ফেলে, সে যেন দ্রুত তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯২৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
অক্ষম বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে হজ
খাসআম গোত্রের এক নারী বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর ফরজ করা হজ আমার বৃদ্ধ বাবার ওপর এমন অবস্থায় এসেছে যে, তিনি বাহনের ওপর স্থির হয়ে বসতে পারেন না। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ করতে পারি? নবীজি ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৩৪ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত
আলেমগণ বলেছেন, অন্যের পক্ষ থেকে (বদলি) হজকারীর জন্য আগে নিজের ফরজ হজ আদায় করা উত্তম। এ বিষয়ে বিস্তারিত মাসআলা আলেমদের কাছ থেকে জেনে নিন।
নারীদের জন্য শ্রেষ্ঠ জিহাদ
আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি, তাহলে আমরা কি জিহাদ করব না? নবীজি ﷺ বললেন: “তোমাদের (নারীদের) জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো মাবরুর হজ।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫২০
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:১৯৭, ৪৩:১৩–১৪ • সহিহ বুখারি: ১৫১৩, ১৫২০, ১৫২১, ১৮০৪, ২৭৩৮ • সহিহ মুসলিম: ১০১৫, ১৩৩৪, ১৩৪২, ১৩৫০, ১৬২৭, ১৯২৭ • আবু দাউদ ২৬০৮
Leave a Reply