☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

দুই ঈদের সুন্নাহ ও আদব

ইসলামে বছরে দুটি ঈদ: রমজান শেষে ঈদুল ফিতর এবং যিলহজের দশম দিনে ঈদুল আজহা। এ দুটি দিন আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, তাকবির ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের দিন। সহিহ হাদিসের আলোকে দুই ঈদের সুন্নাহ ও আদব তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. আল্লাহ প্রদত্ত দুটি উৎসব
  2. তাকবির ও কৃতজ্ঞতা
  3. ঈদুল ফিতরে নামাজের আগে খাওয়া
  4. ঈদুল আজহায় নামাজের পরে খাওয়া
  5. প্রথমে নামাজ, তারপর খুতবা
  6. সবাইকে ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া
  7. ভিন্ন পথে ফেরা
  8. সদকাতুল ফিতর ও কুরবানি
  9. ঈদের দিন রোজা নিষেধ
  10. শুভেচ্ছা বিনিময়

আল্লাহ প্রদত্ত দুটি উৎসব

হাদিস

আনাস (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন, সেখানকার লোকদের দুটি দিন আছে, যেদিন তারা খেলাধুলা ও আনন্দ করে। তিনি বললেন: “আল্লাহ তোমাদের এ দুটি দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন: ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১১৩৪ (শাইখ আলবানি: সহিহ)

তাকবির ও কৃতজ্ঞতা

কুরআন

وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

“…আর যাতে তোমরা (রোজার) সংখ্যা পূর্ণ করো, আল্লাহ তোমাদের যে হিদায়াত দিয়েছেন সেজন্য তাঁর মহত্ত্ব ঘোষণা (তাকবির) করো, এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।”

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫

আলেমগণ এ আয়াতের ভিত্তিতে ঈদুল ফিতরের রাত ও সকালে বেশি বেশি তাকবির পড়াকে সুন্নাত বলেছেন। আর ঈদুল আজহায় যিলহজের প্রথম দশক ও আইয়ামে তাশরিকে তাকবির পড়া সুন্নাত।

ঈদুল ফিতরে নামাজের আগে খাওয়া

হাদিস

আনাস (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে (ঈদগাহে) বের হতেন না। আর তিনি বিজোড় সংখ্যায় খেজুর খেতেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৫৩

ঈদুল আজহায় নামাজের পরে খাওয়া

হাদিস

বুরাইদা (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিন নামাজ না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না।

জামে তিরমিজি, হাদিস ৫৪২; সুনান ইবনু মাজাহ ১৭৫৬ (শাইখ আলবানি: সহিহ)

প্রথমে নামাজ, তারপর খুতবা

হাদিস

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহে যেতেন। সেখানে প্রথমে নামাজ পড়তেন। তারপর মানুষের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন, আর মানুষ তাদের কাতারে বসে থাকত। তিনি তাদের উপদেশ দিতেন, নির্দেশনা দিতেন এবং আদেশ করতেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৫৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৮৯ (সংক্ষেপিত)

সবাইকে ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া

হাদিস

উম্মু আতিয়্যা (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ আমাদের আদেশ দিয়েছেন, আমরা যেন দুই ঈদে কিশোরী, পর্দানশীন নারী এবং মাসিকগ্রস্ত নারীদেরও (ঈদগাহে) নিয়ে যাই। মাসিকগ্রস্ত নারীরা নামাজের স্থান থেকে দূরে থাকবে, তবে কল্যাণ ও মুসলিমদের দোয়ায় শরিক হবে।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৭৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৯০ (সংক্ষেপিত)

ভিন্ন পথে ফেরা

হাদিস

জাবির (রা.) বলেন, ঈদের দিন নবীজি ﷺ এক পথে (ঈদগাহে) যেতেন এবং ভিন্ন পথে ফিরতেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৮৬

আলেমগণ এর কয়েকটি হিকমত উল্লেখ করেছেন: দুই পথের মানুষকে সালাম দেওয়া, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, এবং উভয় পথ কিয়ামতের দিন সাক্ষী হওয়া।

সদকাতুল ফিতর ও কুরবানি

ঈদুল ফিতরের নামাজে বের হওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সহিহ বুখারি ১৫০৩; সহিহ মুসলিম ৯৮৪)। আর ঈদুল আজহায় নামাজের পর কুরবানি করতে হয়। নামাজের আগে জবাই করা পশু কুরবানি হিসেবে গণ্য হয় না (সহিহ বুখারি ৫৫৬০; সহিহ মুসলিম ১৯৬১)।

ঈদের দিন রোজা নিষেধ

হাদিস

নবীজি ﷺ দুই দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন: ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আজহার দিন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৯৯১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৩৮ — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত

শুভেচ্ছা বিনিময়

হাফিজ ইবনু হাজার (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সাহাবিরা ঈদের দিন একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বলতেন: “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা” (আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন)। তিনি এর সনদকে হাসান বলেছেন (ফাতহুল বারি, ঈদ অধ্যায়)।

ঈদের দিনের চেকলিস্ট: ঈদের রাত ও সকালে তাকবির পড়ুন। গোসল করে সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরুন। ঈদুল ফিতরে খেজুর খেয়ে, আর ঈদুল আজহায় না খেয়ে ঈদগাহে যান। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিন, ভিন্ন পথে ফিরুন। আত্মীয়-প্রতিবেশীর খোঁজ নিন, আর গরিবদের আনন্দে শরিক করুন। আনন্দ উদযাপন করুন, তবে গুনাহ থেকে দূরে থেকে।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২:১৮৫ • সহিহ বুখারি: ৯৫৩, ৯৫৬, ৯৭৪, ৯৮৬, ১৫০৩, ১৯৯১, ৫৫৬০ • সহিহ মুসলিম: ৮৮৯, ৮৯০, ৯৮৪, ১১৩৮, ১৯৬১ • আবু দাউদ ১১৩৪ • তিরমিজি ৫৪২ • ইবনু মাজাহ ১৭৫৬ • ফাতহুল বারি (ইবনু হাজার)

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *