স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক, এমনকি নবীজির ﷺ পরিবারেও মাঝে মাঝে মনোমালিন্য হয়েছে। কিন্তু ইসলাম শিখিয়েছে কীভাবে ধৈর্য, ক্ষমা ও সুন্দর মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়। শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো, আর মীমাংসা আল্লাহর প্রিয় কাজ। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
- শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ
- মীমাংসাই উত্তম
- দুই পরিবার থেকে দুই সালিশ
- গুণগুলোর দিকে তাকানো
- মীমাংসার জন্য সুন্দর কথা
- পারস্পরিক অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না
- নবীজির ﷺ কোমল মধ্যস্থতা
শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ
“ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে, তারপর তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করে, সে তার সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। ইবলিস বলে, তুমি কিছুই করোনি। আরেকজন এসে বলে, আমি তাকে (এক ব্যক্তিকে) ছাড়িনি যতক্ষণ না তার ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। তখন ইবলিস তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে: তুমিই তো (আসল কাজ করেছ)!”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৩ — জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত
তাই দাম্পত্য কলহের সময় মনে রাখতে হবে, শয়তান এ বিরোধকে বাড়িয়ে বিচ্ছেদে পরিণত করতে চায়।
মীমাংসাই উত্তম
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
“আর মীমাংসাই উত্তম।”
সূরা আন-নিসা ৪:১২৮ — স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ আয়াতের অংশ
দুই পরিবার থেকে দুই সালিশ
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا
“আর যদি তোমরা তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন সালিশ এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠাও। তারা উভয়ে যদি মীমাংসা চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করে দেবেন।”
সূরা আন-নিসা ৪:৩৫
শিক্ষা: বিরোধ ঘরের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া বা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা নয়। বরং দুই পরিবারের বিজ্ঞ ও কল্যাণকামী মানুষের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা। আর আন্তরিক নিয়ত থাকলে আল্লাহ নিজেই সমঝোতা সৃষ্টি করে দেন।
গুণগুলোর দিকে তাকানো
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাবে সে সন্তুষ্ট হবে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৯ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
মীমাংসার জন্য সুন্দর কথা
“সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য ভালো কথা পৌঁছে দেয় বা ভালো কথা বলে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৯২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬০৫ — উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) থেকে বর্ণিত
অর্থাৎ মধ্যস্থতাকারী একজনের কাছে অন্যজনের ভালো দিকগুলো তুলে ধরবেন, কটু কথা পৌঁছে দেবেন না।
পারস্পরিক অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না
وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
“আর তোমরা পারস্পরিক অনুগ্রহ ও সদাচরণের কথা ভুলে যেয়ো না। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।”
সূরা আল-বাকারা ২:২৩৭
এ আয়াত বিচ্ছেদের প্রসঙ্গে নাজিল হলেও এর শিক্ষা সব সম্পর্কের জন্য: রাগের মুহূর্তে একসঙ্গে কাটানো সুন্দর দিনগুলো ও পরস্পরের ত্যাগ ভুলে যেয়ো না।
নবীজির ﷺ কোমল মধ্যস্থতা
একদিন নবীজি ﷺ ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে গিয়ে আলি (রা.)-কে পেলেন না। জিজ্ঞেস করলে ফাতিমা (রা.) জানালেন, তাঁদের মধ্যে কিছু মনোমালিন্য হয়েছে, তাই তিনি বেরিয়ে গেছেন। নবীজি ﷺ তাঁকে খুঁজে মসজিদে শুয়ে থাকতে দেখলেন, তাঁর শরীরে মাটি লেগে ছিল। নবীজি ﷺ নিজ হাতে মাটি মুছে দিতে দিতে স্নেহভরে বললেন: “ওঠো, হে আবু তুরাব (মাটির বাবা)! ওঠো, হে আবু তুরাব!”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৪১ — সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
নবীজি ﷺ কাউকে দোষারোপ করেননি, বরং স্নেহ ও রসিকতা দিয়ে পরিবেশ হালকা করেছেন। পরবর্তীতে “আবু তুরাব” নামটি আলি (রা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় নাম হয়ে যায়।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:২৩৭, ৪:৩৫, ৪:১২৮, ২৫:৭৪ • সহিহ বুখারি: ৪৪১, ২৬৯২ • সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯, ২৬০৫, ২৮১৩
Leave a Reply