নুহ (আ.) ছিলেন পৃথিবীবাসীর কাছে প্রেরিত প্রথম রাসুল। সাড়ে নয়শ বছর ধরে তিনি নিজ জাতিকে দাওয়াত দিয়েছেন: রাতে-দিনে, প্রকাশ্যে-গোপনে। উপহাস, প্রত্যাখ্যান আর অল্প কয়েকজনের ঈমান, তবু তিনি ধৈর্য হারাননি। দাওয়াতের পথে যাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন, তাঁদের জন্য নুহ (আ.)-এর জীবন সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
- পৃথিবীবাসীর কাছে প্রথম রাসুল
- সাড়ে নয়শ বছরের দাওয়াত
- রাতে-দিনে, প্রকাশ্যে-গোপনে
- প্রত্যাখ্যান ও উপহাস
- অল্প কয়েকজন ঈমান এনেছিল
- সংখ্যা নয়, দায়িত্ব পালনই সফলতা
- দাওয়াতকারীর জন্য শিক্ষা
পৃথিবীবাসীর কাছে প্রথম রাসুল
কিয়ামতের দিন মানুষ সুপারিশের জন্য নুহ (আ.)-এর কাছে গিয়ে বলবে: “হে নুহ, আপনি পৃথিবীবাসীর কাছে প্রেরিত প্রথম রাসুল, আর আল্লাহ আপনাকে ‘কৃতজ্ঞ বান্দা’ নামে অভিহিত করেছেন…”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৪০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (দীর্ঘ শাফাআতের হাদিসের অংশ)
সাড়ে নয়শ বছরের দাওয়াত
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا
“আর আমি নুহকে তাঁর জাতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন।”
সূরা আল-আনকাবুত ২৯:১৪
রাতে-দিনে, প্রকাশ্যে-গোপনে
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا
“তিনি বললেন: হে আমার রব, আমি আমার জাতিকে রাতে ও দিনে দাওয়াত দিয়েছি, কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নই শুধু বাড়িয়েছে।”
সূরা নুহ ৭১:৫–৬
ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا
“তারপর আমি তাদের প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি। তারপর তাদের কাছে ঘোষণা করেও বলেছি, আবার গোপনে একান্তেও বলেছি।”
সূরা নুহ ৭১:৮–৯
শিক্ষা: নুহ (আ.) দাওয়াতের সব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন: সময়ের ভিন্নতা (রাত-দিন) এবং পদ্ধতির ভিন্নতা (প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে ও একান্তে)। এক পদ্ধতিতে কাজ না হলে অন্য পদ্ধতি চেষ্টা করেছেন।
প্রত্যাখ্যান ও উপহাস
وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا
“আর যখনই আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদের ক্ষমা করেন, তারা কানে আঙুল দিয়েছে, নিজেদের কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়েছে, (অবাধ্যতায়) অটল থেকেছে এবং চরম অহংকার করেছে।”
সূরা নুহ ৭১:৭
আল্লাহর আদেশে তিনি যখন নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন জাতির নেতারা যতবার পাশ দিয়ে যেত, তাঁকে উপহাস করত (১১:৩৮)। তবু তিনি নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন।
অল্প কয়েকজন ঈমান এনেছিল
وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ
“আর অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ তাঁর সঙ্গে ঈমান আনেনি।”
সূরা হুদ ১১:৪০
সংখ্যা নয়, দায়িত্ব পালনই সফলতা
“আমার সামনে উম্মতদের পেশ করা হলো। আমি দেখলাম, কোনো নবীর সঙ্গে ছোট একটি দল, কোনো নবীর সঙ্গে এক-দুজন মানুষ, আর কোনো নবীর সঙ্গে একজনও নেই।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
একজন নবী, যাঁর একজন অনুসারীও হয়নি, তিনিও আল্লাহর কাছে সফল, কারণ তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। দাওয়াতকারীর সফলতা অনুসারীর সংখ্যায় নয়, আন্তরিকতা ও ধৈর্যে।
দাওয়াতকারীর জন্য শিক্ষা
- দীর্ঘ ধৈর্য: ফলাফল দ্রুত না এলেও হতাশ না হওয়া।
- পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য: সময়, পরিবেশ ও মানুষ বুঝে প্রকাশ্যে বা একান্তে কথা বলা।
- উপহাস সহ্য করা: সত্যের পথে চললে বিদ্রূপ আসবেই।
- ফলাফল আল্লাহর হাতে: “আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন” (২৮:৫৬)।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১১:৩৮, ১১:৪০, ২৮:৫৬, ২৯:১৪, ৭১:৫–৯ • সহিহ বুখারি: ৩৩৪০, ৫৭০৫ • সহিহ মুসলিম: ১৯৪, ২২০
Leave a Reply