বাবা-মায়ের মৃত্যুতে তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং দোয়া, ক্ষমা প্রার্থনা, তাঁদের পক্ষ থেকে দান, ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত বাস্তবায়ন, এবং তাঁদের প্রিয়জনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার মাধ্যমে সন্তান তাঁদের জন্য নেকির ধারা চালু রাখতে পারে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো।
- নেক সন্তানের দোয়া: চলমান সওয়াব
- বাবা-মায়ের জন্য কুরআনি দোয়া
- তাঁদের পক্ষ থেকে সদকা
- ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত বাস্তবায়ন
- তাঁদের পক্ষ থেকে হজ
- তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে সদাচরণ
- জানাজায় অংশগ্রহণের ফজিলত
নেক সন্তানের দোয়া: চলমান সওয়াব
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়, এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
বাবা-মায়ের জন্য কুরআনি দোয়া
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”
সূরা আল-ইসরা ১৭:২৪
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
“হে আমার রব, আমাকে, আমার বাবা-মাকে, যে ঈমান নিয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাকে, এবং সব মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করুন।”
সূরা নুহ ৭১:২৮
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
“হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আমাকে, আমার বাবা-মাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন।”
সূরা ইবরাহিম ১৪:৪১
তাঁদের পক্ষ থেকে সদকা
এক ব্যক্তি নবীজিকে ﷺ বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমার ধারণা, তিনি কথা বলতে পারলে সদকা করতেন। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? নবীজি ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০০৪ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
সাদ ইবনু উবাদা (রা.) মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পক্ষ থেকে নিজের একটি বাগান সদকা করে দিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৫৬)।
ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত বাস্তবায়ন
مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ
“(মীরাস বণ্টন হবে) মৃত ব্যক্তির করা ওসিয়ত পূরণ এবং ঋণ পরিশোধের পর।”
সূরা আন-নিসা ৪:১১
শহিদের সব গুনাহ মাফ হলেও ঋণ মাফ হয় না (সহিহ মুসলিম ১৮৮৬)। তাই বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে সবার আগে তাঁদের ঋণ পরিশোধ করা, এবং শরিয়তসম্মত সীমার (এক-তৃতীয়াংশ) মধ্যে তাঁদের ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা সন্তানদের দায়িত্ব।
তাঁদের পক্ষ থেকে হজ
জুহাইনা গোত্রের এক নারী এসে বললেন, আমার মা হজের মানত করেছিলেন, কিন্তু হজ করার আগেই মারা গেছেন। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ করব? নবীজি ﷺ বললেন: “হ্যাঁ, তাঁর পক্ষ থেকে হজ করো। বলো তো, তোমার মায়ের যদি কোনো ঋণ থাকত, তুমি কি তা পরিশোধ করতে না? আল্লাহর পাওনা পরিশোধ করো, কেননা আল্লাহর পাওনা পরিশোধের অধিক উপযুক্ত।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮৫২ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত
তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে সদাচরণ
إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ
“সবচেয়ে বড় সদাচরণ হলো, সন্তান তার বাবার প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৫২ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
ইবনু উমর (রা.) মক্কার পথে এক বেদুইনকে নিজের গাধা ও পাগড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ লোকটির বাবা ছিলেন তাঁর বাবা উমর (রা.)-এর বন্ধু। তারপর তিনি ওপরের হাদিসটি বর্ণনা করেন (সহিহ মুসলিম ২৫৫২)।
জানাজায় অংশগ্রহণের ফজিলত
“যে ব্যক্তি জানাজায় উপস্থিত হয়ে নামাজ পড়ে, তার জন্য এক কিরাত সওয়াব। আর যে দাফন পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, তার জন্য দুই কিরাত।” জিজ্ঞেস করা হলো, দুই কিরাত কী? তিনি বললেন: “দুটি বিশাল পাহাড়ের সমান।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩২৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৪৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৪:১১, ১৪:৪১, ১৭:২৪, ৭১:২৮ • সহিহ বুখারি: ১৩২৫, ১৩৮৮, ১৮৫২, ২৭৫৬ • সহিহ মুসলিম: ৯৪৫, ১০০৪, ১৬৩১, ১৮৮৬, ২৫৫২
Leave a Reply