☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

কোমলতা ও সহনশীলতা: আল্লাহর প্রিয় গুণ

কোমলতা (রিফক) ও সহনশীলতা (হিলম) এমন দুটি গুণ, যা আল্লাহ ভালোবাসেন। কোমলতা যেকোনো কাজকে সুন্দর করে, আর এর অভাব সব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে। নবীজি ﷺ কঠিনতম পরিস্থিতিতেও কোমলতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ দুটি গুণ তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. রহমানের বান্দাদের বৈশিষ্ট্য
  2. আল্লাহ কোমল, কোমলতা ভালোবাসেন
  3. কোমলতা থেকে বঞ্চিত মানে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত
  4. যে দুটি গুণ আল্লাহ ভালোবাসেন
  5. কটূক্তির জবাবেও সংযম
  6. রূঢ় বেদুইনের প্রতি নবীজির ﷺ আচরণ
  7. জাহান্নাম যাদের জন্য হারাম

রহমানের বান্দাদের বৈশিষ্ট্য

কুরআন

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

“আর রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে বিনম্রভাবে চলাফেরা করে, আর যখন মূর্খরা তাদের সঙ্গে (অশোভন) কথা বলে, তখন তারা বলে: সালাম (শান্তি)।”

সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৩

আল্লাহ কোমল, কোমলতা ভালোবাসেন

হাদিস

إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল, তিনি কোমলতা ভালোবাসেন। আর কোমলতার কারণে তিনি যা দান করেন, কঠোরতার কারণে তা দান করেন না, অন্য কোনো কিছুর কারণেও তা দান করেন না।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯৩ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

“নম্রতা যে জিনিসে থাকে, তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর যে জিনিস থেকে নম্রতা সরিয়ে নেওয়া হয়, তাকে কুৎসিত করে দেয়।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯৪ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত

কোমলতা থেকে বঞ্চিত মানে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত

হাদিস

مَنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ يُحْرَمِ الْخَيْرَ

“যে ব্যক্তি কোমলতা থেকে বঞ্চিত, সে সব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯২ — জারির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত

যে দুটি গুণ আল্লাহ ভালোবাসেন

হাদিস

إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ وَالْأَنَاةُ

নবীজি ﷺ আব্দুল কায়স গোত্রের নেতা আশাজ্জ (রা.)-কে বলেছিলেন: “তোমার মধ্যে দুটি গুণ আছে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত

“হিলম” মানে রাগের মুহূর্তেও সংযত ও সহনশীল থাকা, আর “আনাত” মানে তাড়াহুড়া না করে ভেবেচিন্তে ধীরস্থিরভাবে কাজ করা। দুটি গুণই একজন নেতা ও দায়িত্বশীলের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়।

কটূক্তির জবাবেও সংযম

হাদিস

কয়েকজন ইহুদি নবীজির ﷺ কাছে এসে সালামের বদলে বলল: “আস-সামু আলাইকুম” (তোমার মৃত্যু হোক)। আয়েশা (রা.) কঠোর ভাষায় তাদের জবাব দিলেন। নবীজি ﷺ বললেন: “থামো, হে আয়েশা! আল্লাহ সব বিষয়ে কোমলতা ভালোবাসেন।” আয়েশা (রা.) বললেন, আপনি কি শোনেননি তারা কী বলেছে? তিনি বললেন: “আমি তো (শুধু) বলেছি: ‘ওয়া আলাইকুম’ (তোমাদের ওপরও)।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৬৫ (সংক্ষেপিত)

শিক্ষা: অন্যায় কথার জবাবে ন্যায়সংগত উত্তর দেওয়া যায়, কিন্তু রূঢ়তা ও গালাগালি দিয়ে নয়।

রূঢ় বেদুইনের প্রতি নবীজির ﷺ আচরণ

হাদিস

আনাস (রা.) বলেন, আমি নবীজির ﷺ সঙ্গে হাঁটছিলাম। তাঁর গায়ে মোটা পাড়ের একটি নাজরানি চাদর ছিল। এক বেদুইন এসে চাদর ধরে এত জোরে টান দিল যে তাঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে গেল। তারপর বলল: হে মুহাম্মাদ, তোমার কাছে আল্লাহর যে সম্পদ আছে, তা থেকে আমাকে দেওয়ার আদেশ দাও। নবীজি ﷺ তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, তারপর তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৩১৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৫৭

জাহান্নাম যাদের জন্য হারাম

হাদিস

“আমি কি তোমাদের বলব না, কার জন্য জাহান্নাম হারাম, অথবা জাহান্নাম কার জন্য হারাম? প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যে মানুষের কাছের, কোমল, নম্র ও সহজ।”

জামে তিরমিজি, হাদিস ২৪৮৮ (ইমাম তিরমিজি: হাসান) — আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত

কোমলতার অনুশীলন: পরিবারে ধমকের বদলে নরম ভাষায় বলুন। সন্তান বা অধীনস্থের ভুলে আগে বুঝিয়ে বলুন। রাস্তায়, অফিসে বা অনলাইনে কেউ রূঢ় আচরণ করলে উত্তেজিত না হয়ে সংযতভাবে জবাব দিন, অথবা “সালাম” বলে সরে আসুন। আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাড়াহুড়া না করে ধীরস্থিরভাবে ভাবুন।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২৫:৬৩ • সহিহ বুখারি: ৩১৪৯, ৬০২৪ • সহিহ মুসলিম: ১৭, ১০৫৭, ২১৬৫, ২৫৯২, ২৫৯৩, ২৫৯৪ • তিরমিজি ২৪৮৮

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *