হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন হলো আরাফার ময়দানে অবস্থান। এ দিনেই দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার আয়াত নাজিল হয়েছে, আর এ দিনেই নবীজি ﷺ তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আরাফার দিনের মর্যাদা ও বিদায় হজের ভাষণের মূল শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- হজ মানেই আরাফা
- দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার দিন
- জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন
- আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া
- হজে না থাকলে: আরাফার রোজা
- বিদায় হজের ভাষণ: মূল বার্তা
হজ মানেই আরাফা
الْحَجُّ عَرَفَةُ
“হজ হলো আরাফা (আরাফায় অবস্থান)।” যে ব্যক্তি মুজদালিফার রাতে ফজর উদয়ের আগে আরাফায় পৌঁছাতে পারল, সে হজ পেয়ে গেল।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৯৪৯; জামে তিরমিজি, হাদিস ৮৮৯ (সহিহ) — আব্দুর রহমান ইবনু ইয়ামার (রা.) থেকে বর্ণিত
দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার দিন
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
সূরা আল-মায়িদা ৫:৩ • উমর (রা.) বলেন, এ আয়াত নাজিল হয়েছিল আরাফার দিন, শুক্রবারে, যখন নবীজি ﷺ আরাফায় অবস্থান করছিলেন — সহিহ বুখারি ৪৫; সহিহ মুসলিম ৩০১৭
জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন
“আরাফার দিনের চেয়ে বেশি আর কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি নিকটবর্তী হন, তারপর ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন: এরা কী চায়?”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪৮ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া। আর আমি ও আমার আগের নবীগণ যা বলেছি, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসাও তাঁরই, আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৮৫ (শাইখ আলবানি: হাসান) — আমর ইবনু শুআইব তাঁর পিতা ও দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন
হজে না থাকলে: আরাফার রোজা
আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে নবীজি ﷺ বলেছেন: “এটি বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২ — আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত
বিদায় হজের ভাষণ: মূল বার্তা
দশম হিজরিতে আরাফার ময়দানে নবীজি ﷺ বিপুলসংখ্যক সাহাবির সামনে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। জাবির (রা.)-এর দীর্ঘ হাদিসে (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮) ভাষণের যে অংশগুলো এসেছে, তার মূল বার্তা হলো:
১. জান-মালের পবিত্রতা: “নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য তেমনই পবিত্র (হারাম), যেমন তোমাদের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর পবিত্র।”
২. জাহেলি প্রথার বিলুপ্তি: জাহেলি যুগের সব রক্তের প্রতিশোধ এবং জাহেলি যুগের সুদ বাতিল ঘোষণা করা হলো।
৩. নারীর অধিকার: “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।” তাদের ওপর তোমাদের হক আছে, আর তোমাদের ওপরও তাদের ন্যায়সংগত ভরণপোষণ ও পোশাকের হক রয়েছে।
৪. আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরা: “আমি তোমাদের মধ্যে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব।”
৫. সাক্ষ্য গ্রহণ: “তোমাদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে?” সাহাবিরা বললেন: আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি (দ্বীন) পৌঁছে দিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কল্যাণ কামনা করেছেন। তখন তিনি আকাশের দিকে শাহাদাত আঙুল তুলে মানুষের দিকে নামিয়ে তিনবার বললেন: “হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮ — জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত (ভাষণের মূল অংশ সংক্ষেপিত)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৫:৩ • সহিহ বুখারি: ৪৫, ৬৭ • সহিহ মুসলিম: ১১৬২, ১২১৮, ১৩৪৮, ৩০১৭ • আবু দাউদ ১৯৪৯ • তিরমিজি: ৮৮৯, ৩৫৮৫
Leave a Reply