সাহাবায়ে কেরাম কুরআন-সুন্নাহর দানের শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন। কেউ সব সম্পদ দিয়ে দিয়েছেন, কেউ অর্ধেক, কেউ সবচেয়ে প্রিয় বাগান, আবার কেউ নিজে ক্ষুধার্ত থেকে মেহমানকে খাইয়েছেন। সহিহ সূত্রে বর্ণিত সাহাবিদের দানের কয়েকটি অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।
- আবু বকর (রা.): সব সম্পদ
- উমর (রা.): অর্ধেক সম্পদ
- উসমান (রা.): তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি
- আবু তালহা (রা.): সবচেয়ে প্রিয় বাগান
- সাদ (রা.)-কে নবীজির ﷺ ভারসাম্যপূর্ণ পরামর্শ
- আনসারি দম্পতির আত্মত্যাগ
আবু বকর (রা.): সব সম্পদ
উমর (রা.) বলেন, একদিন নবীজি ﷺ আমাদের দান করার নির্দেশ দিলেন। তখন আমার কাছে কিছু সম্পদ ছিল। মনে মনে বললাম, আজ যদি কোনো দিন আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারি, তবে আজই সেই দিন। আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এলাম। নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: “পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?” আমি বললাম, এর সমপরিমাণ। আর আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে যা ছিল সব নিয়ে এলেন। নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: “হে আবু বকর, পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?” তিনি বললেন: “তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।” তখন আমি বললাম, আমি কখনো কোনো বিষয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারব না।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৬৭৮; জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৬৭৫ (শাইখ আলবানি: হাসান)
উমর (রা.): অর্ধেক সম্পদ
ওপরের ঘটনাতেই উমর (রা.) নিজের অর্ধেক সম্পদ দান করেছিলেন। এ ঘটনা থেকে সাহাবিদের মধ্যে নেক কাজে প্রতিযোগিতার সুন্দর চিত্র ফুটে ওঠে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন: “আর এতে প্রতিযোগীরা যেন প্রতিযোগিতা করে” (সূরা আল-মুতাফফিফিন ৮৩:২৬)।
উসমান (রা.): তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি
আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা (রা.) বলেন, “জাইশুল উসরা” (তাবুক অভিযানের কষ্টকর বাহিনী) প্রস্তুতের সময় উসমান (রা.) এক হাজার দিনার নিয়ে এসে নবীজির ﷺ কোলে ঢেলে দিলেন। নবীজি ﷺ সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন: “আজকের পর উসমান যা-ই করুক, তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।” কথাটি তিনি দুবার বললেন।
জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৭০১ (ইমাম তিরমিজি: হাসান)
আবু তালহা (রা.): সবচেয়ে প্রিয় বাগান
আনসারদের মধ্যে আবু তালহা (রা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি খেজুর বাগানের মালিক। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল মসজিদে নববির সামনের “বাইরুহা” বাগান। নবীজি ﷺ সেখানে গিয়ে এর সুপেয় পানি পান করতেন। যখন আয়াত নাজিল হলো: “তোমরা কখনো প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় জিনিস থেকে ব্যয় করো” (৩:৯২), তখন আবু তালহা (রা.) বাগানটি আল্লাহর জন্য সদকা করে দিলেন। নবীজি ﷺ বললেন: “বাহ! এটি লাভজনক সম্পদ।” এবং তাঁকে বাগানটি আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করার পরামর্শ দিলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৬১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৯৮ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
সাদ (রা.)-কে নবীজির ﷺ ভারসাম্যপূর্ণ পরামর্শ
সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা.) অসুস্থ অবস্থায় নিজের সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ, তারপর অর্ধেক দান করার অনুমতি চাইলেন। নবীজি ﷺ অনুমতি দিলেন না। তিনি এক-তৃতীয়াংশের কথা বললে নবীজি ﷺ বললেন: “এক-তৃতীয়াংশ (দিতে পারো), তবে এক-তৃতীয়াংশও অনেক। তোমার উত্তরাধিকারীদের মানুষের কাছে হাত পাতা দরিদ্র অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া উত্তম।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৮
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম দানে উৎসাহ দেয়, তবে পরিবারের হক নষ্ট করে নয়। এ কারণেই মৃত্যুর আগে ওসিয়তের মাধ্যমে দানের সর্বোচ্চ সীমা এক-তৃতীয়াংশ।
আনসারি দম্পতির আত্মত্যাগ
নবীজির ﷺ কাছে এক ক্ষুধার্ত মেহমান এলেন। এক আনসারি সাহাবি তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। স্ত্রী জানালেন, ঘরে শুধু বাচ্চাদের খাবার আছে। তাঁরা বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দিলেন, তারপর বাতি নিভিয়ে মেহমানকে বোঝালেন যে তাঁরাও খাচ্ছেন, আর নিজেরা না খেয়ে রাত কাটালেন। সকালে নবীজি ﷺ বললেন: “তোমাদের দুজনের রাতের কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।” এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল হলো: “আর তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়” (৫৯:৯)।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৭৯৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০৫৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩:৯২, ৫৯:৯, ৮৩:২৬ • সহিহ বুখারি: ১২৯৫, ১৪৬১, ৩৭৯৮ • সহিহ মুসলিম: ৯৯৮, ১৬২৮, ২০৫৪ • আবু দাউদ ১৬৭৮ • তিরমিজি: ৩৬৭৫, ৩৭০১
Leave a Reply