উমরা চারটি মৌলিক কাজের সমষ্টি: মিকাত থেকে ইহরাম, কাবাঘরের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ, এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা। এই প্রবন্ধে সহিহ হাদিসে বর্ণিত নবীজির ﷺ পদ্ধতি অনুসারে উমরার ধাপগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। সফরের আগে অভিজ্ঞ আলেম বা মুয়াল্লিমের কাছ থেকে বিস্তারিত শিখে নেওয়ার অনুরোধ রইল।
- ধাপ ১: মিকাত ও ইহরাম
- ধাপ ২: তালবিয়া
- ধাপ ৩: তাওয়াফ
- ধাপ ৪: মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত
- ধাপ ৫: সাফা-মারওয়ার সাঈ
- ধাপ ৬: মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা
ধাপ ১: মিকাত ও ইহরাম
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ মিকাত নির্ধারণ করেছেন: মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, শামবাসীদের জন্য জুহফা, নজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল এবং ইয়েমেনবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম। এগুলো এসব এলাকার অধিবাসীদের জন্য এবং অন্য যারা হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে এসব পথ দিয়ে আসে তাদের জন্যও।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৮১
ইরাকবাসীদের জন্য মিকাত হলো যাতু ইরক (সহিহ মুসলিম ১১৮৩)। বিমানে ভ্রমণকারীরা যে মিকাতের ওপর বা বরাবর দিয়ে অতিক্রম করবেন, তার আগেই ইহরাম বাঁধবেন। বিমান সংস্থাগুলো সাধারণত এ সময়ের ঘোষণা দিয়ে থাকে।
পুরুষদের ইহরামের পোশাক: সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর। নবীজি ﷺ বলেছেন, ইহরামকারী জামা, পাগড়ি, পায়জামা, টুপিওয়ালা জোব্বা এবং মোজা পরবে না (সহিহ বুখারি ১৫৪২; সহিহ মুসলিম ১১৭৭)। নারীরা তাঁদের স্বাভাবিক শালীন পোশাকেই ইহরাম বাঁধবেন।
ধাপ ২: তালবিয়া
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
“আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৮৪ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
ইহরামের নিয়ত করার পর থেকে তাওয়াফ শুরু পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়া পড়বেন। পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচুস্বরে পড়বেন।
ধাপ ৩: তাওয়াফ
হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) থেকে শুরু করে কাবাকে বাম পাশে রেখে সাত চক্কর দিতে হয়। জাবির (রা.)-এর দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, নবীজি ﷺ প্রথম তিন চক্করে রমল (ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত চলা) করেছেন, আর বাকি চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হেঁটেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮)। রমল শুধু পুরুষদের জন্য।
উমর (রা.) হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তাতে চুমু খেলেন এবং বললেন: “আমি জানি, তুমি একটি পাথর মাত্র। তুমি কোনো উপকারও করতে পারো না, ক্ষতিও করতে পারো না। আমি যদি নবীজিকে ﷺ তোমাকে চুমু খেতে না দেখতাম, তবে আমি তোমাকে চুমু খেতাম না।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২৭০
ভিড়ের কারণে চুমু খাওয়া সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করলেই যথেষ্ট। কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে পড়বেন: “রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আযাবান নার” (সুনান আবু দাউদ ১৮৯২, হাসান)। তাওয়াফের বাকি সময়ে নিজের ভাষায় যেকোনো দোয়া ও যিকির করা যায়।
ধাপ ৪: মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত
وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى
“আর তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান বানাও।”
সূরা আল-বাকারা ২:১২৫
তাওয়াফ শেষে নবীজি ﷺ মাকামে ইবরাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়েছেন, এতে সূরা আল-কাফিরুন ও সূরা আল-ইখলাস তিলাওয়াত করেছেন (সহিহ মুসলিম ১২১৮)। ভিড় থাকলে মসজিদের যেকোনো স্থানে পড়া যায়।
ধাপ ৫: সাফা-মারওয়ার সাঈ
জাবির (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, নবীজি ﷺ সাফার কাছে গিয়ে তিলাওয়াত করলেন: “ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ” (২:১৫৮), এবং বললেন: “আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি।” এরপর সাফায় উঠে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ব ও মহত্ত্ব ঘোষণা করলেন এবং দোয়া করলেন (সহিহ মুসলিম ১২১৮)।
সাফা থেকে মারওয়া এক চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা আরেক চক্কর। এভাবে সাত চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হয়। সবুজ বাতি চিহ্নিত অংশে পুরুষরা দ্রুত হাঁটবেন।
ধাপ ৬: মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা
নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, মাথা মুণ্ডনকারীদের ওপর রহম করুন।” সাহাবিরা বললেন, আর যারা চুল ছোট করে? তিনি আবার মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য দোয়া করলেন। তৃতীয়বারে বললেন: “এবং চুল ছোটকারীদের ওপরও।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৭২৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩০১ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
নারীরা মাথা মুণ্ডন করবেন না, শুধু চুলের অগ্রভাগ থেকে সামান্য কাটবেন (সুনান আবু দাউদ ১৯৮৫, সহিহ)। এর মাধ্যমে উমরা সম্পন্ন হয় এবং ইহরামের নিষেধাজ্ঞাগুলো উঠে যায়।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:১২৫, ২:১৫৮ • সহিহ বুখারি: ১৫২৪, ১৫৪২, ১৫৪৯, ১৫৯৭, ১৭২৭ • সহিহ মুসলিম: ১১৭৭, ১১৮১, ১১৮৩, ১১৮৪, ১২১৮, ১২৭০, ১৩০১ • আবু দাউদ: ১৮৯২, ১৯৮৫
Leave a Reply