☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

কুরআন তিলাওয়াতের আদব

কুরআন আল্লাহর কালাম। তাই এর তিলাওয়াত, শ্রবণ ও সংরক্ষণের রয়েছে বিশেষ আদব। সুন্দর কণ্ঠে ধীরে ধীরে তিলাওয়াত, মনোযোগ দিয়ে শোনা, নিয়মিত পড়ে মুখস্থ ধরে রাখা, এসবই কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা। দলিলসহ কুরআন তিলাওয়াতের আদব তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. আউযুবিল্লাহ দিয়ে শুরু
  2. তারতিল ও সুন্দর কণ্ঠ
  3. মনোযোগ দিয়ে শোনা
  4. পবিত্রতা
  5. মুখস্থ ধরে রাখা
  6. কত দিনে খতম করবেন
  7. কুরআনের মজলিসের ফজিলত

আউযুবিল্লাহ দিয়ে শুরু

কুরআন

فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

“যখন তুমি কুরআন পড়বে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো।”

সূরা আন-নাহল ১৬:৯৮

তারতিল ও সুন্দর কণ্ঠ

কুরআন

وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا

“আর কুরআন পড়ুন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে।”

সূরা আল-মুযযাম্মিল ৭৩:৪

হাদিস

আনাস (রা.)-কে নবীজির ﷺ তিলাওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, নবীজি ﷺ (মদের হরফগুলো) টেনে টেনে পড়তেন। তারপর তিনি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পড়ে দেখালেন, বিসমিল্লাহ, আর-রাহমান ও আর-রাহিম টেনে টেনে পড়ে।

সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৪৬

হাদিস

زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ

“তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে কুরআনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করো।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৪৬৮; সুনান নাসাঈ ১০১৫ (সহিহ) — বারা ইবনু আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

“যে ব্যক্তি সুন্দর সুরে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৫২৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

আলেমগণ বলেছেন, এখানে সুন্দর সুর মানে তাজবিদের নিয়ম মেনে হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠে পড়া। গানের সুরের মতো নিয়ম ভেঙে টেনে পড়া এর উদ্দেশ্য নয়।

মনোযোগ দিয়ে শোনা

কুরআন

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

“আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহম করা হয়।”

সূরা আল-আরাফ ৭:২০৪

পবিত্রতা

অজু অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম ও আদবের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ আলেমের মতে, অজু ছাড়া মুসহাফ (কুরআনের কপি) স্পর্শ করা জায়েজ নয়। তাঁরা সূরা আল-ওয়াকিআ ৫৬:৭৯ (“পবিত্ররা ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না”) এবং আমর ইবনু হাযমের পত্রের হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। তবে আয়াতটির তাফসির নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ আছে। অজু ছাড়া স্পর্শ না করে মুখস্থ পড়া জায়েজ।

মুখস্থ ধরে রাখা

হাদিস

“তোমরা এই কুরআনের প্রতি যত্নবান থাকো (নিয়মিত পড়তে থাকো)। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর কসম! রশিতে বাঁধা উট যেমন ছুটে পালায়, কুরআন (স্মৃতি থেকে) তার চেয়েও দ্রুত ছুটে যায়।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৯১ — আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

“(কিয়ামতের দিন) কুরআনের সাথীকে বলা হবে: পড়তে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো। দুনিয়াতে যেভাবে তারতিলের সঙ্গে পড়তে, সেভাবে পড়ো। তোমার শেষ আয়াতে পৌঁছানোর স্থানটিই হবে তোমার মর্যাদার স্থান।”

জামে তিরমিজি, হাদিস ২৯১৪ (হাসান সহিহ); সুনান আবু দাউদ ১৪৬৪ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত

কত দিনে খতম করবেন

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) প্রতিদিন কুরআন খতম করতে চাইলে নবীজি ﷺ তাঁকে প্রথমে এক মাসে খতম করার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বেশি পারবেন বললে শেষ পর্যন্ত বলেন: “তাহলে সাত দিনে খতম করো, এর বেশি কোরো না” (সহিহ বুখারি ৫০৫৪; সহিহ মুসলিম ১১৫৯)। অন্য হাদিসে এসেছে, যে তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করে, সে তা বোঝে না (সুনান আবু দাউদ ১৩৯৪; জামে তিরমিজি ২৯৪৯, সহিহ)।

কুরআনের মজলিসের ফজিলত

হাদিস

“যখনই কোনো দল আল্লাহর কোনো ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল হয়, রহমত তাদের ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখেন, আর আল্লাহ তাঁর কাছে থাকা ফেরেশতাদের মাঝে তাদের কথা আলোচনা করেন।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

তিলাওয়াতের চেকলিস্ট: অজু করুন, কিবলামুখী হয়ে বসুন, আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ুন, তাজবিদ মেনে ধীরে পড়ুন, অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন, আর রহমতের আয়াতে রহমত চান এবং আজাবের আয়াতে আশ্রয় চান।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ৭:২০৪, ১৬:৯৮, ৫৬:৭৯, ৭৩:৪ • সহিহ বুখারি: ৫০৩৩, ৫০৪৬, ৫০৫৪, ৭৫২৭ • সহিহ মুসলিম: ৭৯১, ১১৫৯, ২৬৯৯ • আবু দাউদ: ১৩৯৪, ১৪৬৪, ১৪৬৮ • তিরমিজি: ২৯১৪, ২৯৪৯ • নাসাঈ ১০১৫

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *