অজু ঠিক থাকা নামাজ সহিহ হওয়ার শর্ত। তাই কোন কোন কারণে অজু ভাঙে আর কোন কারণে ভাঙে না, তা জানা জরুরি। পাশাপাশি সফরে ও শীতে সহজতার জন্য ইসলাম মোজার ওপর মাসেহের অনুমতি দিয়েছে। সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো, এবং যেসব বিষয়ে ফকিহদের মতভেদ আছে সেগুলোও উল্লেখ করা হলো।
- যেসব কারণে অজু ভাঙে (সর্বসম্মত)
- সন্দেহে অজু ভাঙে না
- যেসব বিষয়ে মতভেদ আছে
- মোজার ওপর মাসেহ
- মাসেহের সময়সীমা
- মিসওয়াকের ফজিলত
যেসব কারণে অজু ভাঙে (সর্বসম্মত)
“যার অজু ভেঙে গেছে, সে অজু না করা পর্যন্ত আল্লাহ তার নামাজ কবুল করেন না।” হাদরামাউতের এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আবু হুরায়রা, অজু ভাঙা (হাদাস) কী? তিনি বললেন: (পেছনের রাস্তা দিয়ে) নিঃশব্দে বা শব্দসহ বায়ু বের হওয়া।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
- পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়া: পেশাব, পায়খানা, বায়ু ইত্যাদি। আল্লাহ বলেছেন, “অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার থেকে আসে…” (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬)।
- মজি (কামরস) বের হওয়া: এতে লজ্জাস্থান ধুয়ে অজু করতে হবে, গোসল লাগবে না (সহিহ বুখারি ২৬৯; সহিহ মুসলিম ৩০৩)।
- গভীর ঘুম, বেহুঁশ হওয়া বা জ্ঞান হারানো। এতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তাই অজু ভেঙে যায়। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। তবে হালকা তন্দ্রা বা বসে বসে ঝিমুনির ক্ষেত্রে বিস্তারিত মতভেদ আছে।
সন্দেহে অজু ভাঙে না
এক ব্যক্তি নবীজিকে ﷺ জানাল, নামাজের মধ্যে তার মনে হয় যেন কিছু (বায়ু) বের হয়েছে। নবীজি ﷺ বললেন: “সে যেন নামাজ না ছাড়ে, যতক্ষণ না আওয়াজ শোনে বা গন্ধ পায়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৬১ — আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত
এ হাদিস থেকে ফকিহগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি নিয়েছেন: নিশ্চিত বিষয় সন্দেহের কারণে বাতিল হয় না। অজু থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হলে শুধু সন্দেহের কারণে অজু ভাঙে না। এটি ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার বড় একটি উপায়।
যেসব বিষয়ে মতভেদ আছে
- লজ্জাস্থান স্পর্শ করা: বুসরা বিনতে সাফওয়ান (রা.)-এর হাদিসে অজু করার নির্দেশ এসেছে (সুনান আবু দাউদ ১৮১)। আবার তালক ইবনু আলি (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, এটি শরীরেরই একটি অংশ (সুনান আবু দাউদ ১৮২)। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে অজু ভাঙে, আর হানাফি মাজহাবে ভাঙে না।
- উটের গোশত খাওয়া: সহিহ মুসলিমে (হাদিস ৩৬০) উটের গোশত খেলে অজু করার নির্দেশ এসেছে। হাম্বলি মাজহাব এ অনুযায়ী অজু ভাঙার মত দেয়, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে অজু ভাঙে না।
- রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া ও বমি: হানাফি মাজহাবে প্রবাহিত রক্ত-পুঁজ এবং মুখ ভরে বমি হলে অজু ভাঙে। অন্যান্য মাজহাবে এগুলোতে অজু ভাঙে না।
মোজার ওপর মাসেহ
মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন, এক সফরে আমি নবীজির ﷺ সঙ্গে ছিলাম। তিনি অজু করার সময় আমি তাঁর মোজা খুলে দিতে চাইলাম। তিনি বললেন: “থাক, আমি পবিত্র অবস্থায় এগুলো পরেছি।” এরপর তিনি মোজার ওপর মাসেহ করলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪
অর্থাৎ মাসেহের শর্ত হলো পূর্ণ অজু করার পর মোজা পরা। আলি (রা.) বলেছেন, দ্বীন যদি নিজের যুক্তি অনুযায়ী চলত, তবে মোজার নিচের অংশ মাসেহ করাই বেশি যুক্তিসংগত হতো। অথচ আমি নবীজিকে ﷺ মোজার ওপরের অংশে মাসেহ করতে দেখেছি (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৬২, সহিহ)।
মাসেহের সময়সীমা
আলি (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত এবং মুকিমের (নিজ এলাকায় অবস্থানকারীর) জন্য এক দিন এক রাত মাসেহের সময় নির্ধারণ করেছেন।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬
কোন ধরনের মোজায় মাসেহ জায়েজ (চামড়ার মোজা নাকি সাধারণ কাপড়ের মোজা), তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ আছে। হানাফি মাজহাবে সাধারণ পাতলা কাপড়ের মোজায় মাসেহ জায়েজ নয়।
মিসওয়াকের ফজিলত
“আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫২ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৫:৬ • সহিহ বুখারি: ১৩৫, ১৩৭, ২০৬, ২৬৯, ৮৮৭ • সহিহ মুসলিম: ২৫২, ২৭৪, ২৭৬, ৩০৩, ৩৬০, ৩৬১ • আবু দাউদ: ১৬২, ১৮১, ১৮২
Leave a Reply