মেহমানদারি নবীদের সুন্নাত ও ঈমানের দাবি। ইবরাহিম (আ.) অচেনা মেহমানদের জন্যও সবচেয়ে ভালো খাবার পরিবেশন করেছেন, আর নবীজি ﷺ মেহমানের সম্মানকে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে মেহমানদারির আদব তুলে ধরা হলো, মেজবান ও মেহমান উভয়ের জন্য।
- ইবরাহিম (আ.)-এর মেহমানদারি
- মেহমানের সম্মান ঈমানের অংশ
- মেহমানদারির সময়সীমা
- খাবার খাওয়ানো উত্তম ইসলাম
- অল্প খাবারেও বরকত
- নিজে না খেয়ে মেহমানকে খাওয়ানো
- মেহমানের আদব
ইবরাহিম (আ.)-এর মেহমানদারি
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ
“আপনার কাছে কি ইবরাহিমের সম্মানিত মেহমানদের ঘটনা পৌঁছেছে?”
সূরা আয-যারিয়াত ৫১:২৪
فَرَاغَ إِلَىٰ أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِينٍ فَقَرَّبَهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ
“তারপর তিনি চুপিচুপি দ্রুত পরিবারের কাছে গেলেন এবং একটি মোটাতাজা (ভুনা) বাছুর নিয়ে এলেন। তারপর তা তাদের সামনে রেখে বললেন: আপনারা খাচ্ছেন না কেন?”
সূরা আয-যারিয়াত ৫১:২৬–২৭
শিক্ষা: মুফাসসিরগণ এ আয়াত থেকে মেহমানদারির কয়েকটি আদব বের করেছেন: মেহমানকে জিজ্ঞেস না করেই দ্রুত আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা, সাধ্যমতো সবচেয়ে ভালো খাবার দেওয়া, খাবার মেহমানের কাছে এগিয়ে দেওয়া, এবং বিনয়ের সঙ্গে খেতে অনুরোধ করা।
মেহমানের সম্মান ঈমানের অংশ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে সম্মান করে। আর যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
মেহমানদারির সময়সীমা
“যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানকে তার প্রাপ্য বিশেষ আপ্যায়ন দিয়ে সম্মান করে।” জিজ্ঞেস করা হলো, বিশেষ আপ্যায়ন কী? তিনি বললেন: “এক দিন ও এক রাত। আর সাধারণ মেহমানদারি তিন দিন। এর বেশি যা হবে, তা সদকা। আর মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে, মেজবানকে কষ্টে ফেলা পর্যন্ত তার কাছে থেকে যাবে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৮ — আবু শুরাইহ আল-খুযায়ি (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
খাবার খাওয়ানো উত্তম ইসলাম
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন কাজটি সর্বোত্তম? নবীজি ﷺ বললেন: “মানুষকে খাবার খাওয়ানো, এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়া।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৯ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত
নবুওয়াতের আগেই খাদিজা (রা.) নবীজির ﷺ যে গুণগুলোর প্রশংসা করেছিলেন, তার একটি ছিল: “আপনি মেহমানের আপ্যায়ন করেন” (সহিহ বুখারি ৩)।
অল্প খাবারেও বরকত
طَعَامُ الِاثْنَيْنِ كَافِي الثَّلَاثَةِ، وَطَعَامُ الثَّلَاثَةِ كَافِي الْأَرْبَعَةِ
“দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট, আর তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৩৯২; অনুরূপ সহিহ মুসলিম ২০৫৮ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
অর্থাৎ ঘরে অল্প খাবার থাকলেও মেহমানকে ফিরিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। ভাগাভাগি করে খেলে আল্লাহ বরকত দেন।
নিজে না খেয়ে মেহমানকে খাওয়ানো
এক আনসারি দম্পতি নিজেদের সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে, বাতি নিভিয়ে, নিজেরা না খেয়ে নবীজির ﷺ মেহমানকে খাইয়েছিলেন। এর প্রশংসায় আয়াত নাজিল হয়: “আর তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়” (৫৯:৯; সহিহ বুখারি ৩৭৯৮; সহিহ মুসলিম ২০৫৪)।
মেহমানের আদব
- প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া ও সালাম দেওয়া (২৪:২৭)।
- মেজবানকে কষ্টে ফেলার মতো দীর্ঘ সময় না থাকা (বুখারি ৬১৩৫)।
- পরিবেশিত খাবারের দোষ না ধরা। নবীজি ﷺ কখনো খাবারের দোষ ধরেননি; পছন্দ হলে খেতেন, না হলে রেখে দিতেন (সহিহ বুখারি ৫৪০৯; সহিহ মুসলিম ২০৬৪)।
- খাওয়া শেষে মেজবানের জন্য দোয়া করা।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২৪:২৭, ৫১:২৪–২৭, ৫৯:৯ • সহিহ বুখারি: ৩, ১২, ৩৭৯৮, ৫৩৯২, ৫৪০৯, ৬০১৮, ৬১৩৫ • সহিহ মুসলিম: ৩৯, ৪৭, ৪৮, ২০৫৪, ২০৫৮, ২০৬৪
Leave a Reply