মক্কায় তেরো বছরের দাওয়াত, নির্যাতন ও ধৈর্যের পর আল্লাহর আদেশে নবীজি ﷺ মদিনায় হিজরত করেন। এ সফর ছিল তাওয়াক্কুল, পরিকল্পনা, বন্ধুত্ব ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হিজরতের মাধ্যমেই মদিনায় প্রথম ইসলামি সমাজের ভিত্তি স্থাপিত হয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে হিজরতের ঘটনা তুলে ধরা হলো।
- প্রিয় মক্কাকে বিদায়
- আবু বকর (রা.)-এর ঘরে পরিকল্পনা
- সাওর গুহায় তিন রাত
- “আমাদের তৃতীয়জন আল্লাহ”
- সুরাকার পিছু ধাওয়া
- মদিনায় অভ্যর্থনা
- মসজিদে নববি নির্মাণ
- আনসার ও মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্ব
প্রিয় মক্কাকে বিদায়
আব্দুল্লাহ ইবনু আদি (রা.) বলেন, আমি নবীজিকে ﷺ মক্কার হাযওয়ারা নামক স্থানে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি: “আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। আমাকে যদি তোমার থেকে বের করে দেওয়া না হতো, তবে আমি কখনো বের হতাম না।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৯২৫ (ইমাম তিরমিজি: হাসান সহিহ)
আবু বকর (রা.)-এর ঘরে পরিকল্পনা
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক দুপুরে নবীজি ﷺ মাথা ঢেকে আবু বকর (রা.)-এর ঘরে এলেন, যা তাঁর স্বাভাবিক সময় ছিল না। তিনি জানালেন, আল্লাহ তাঁকে হিজরতের অনুমতি দিয়েছেন। আবু বকর (রা.) সঙ্গী হওয়ার আবেদন করলেন, নবীজি ﷺ বললেন: হ্যাঁ। আবু বকর (রা.) আগে থেকেই এ সফরের জন্য দুটি উট প্রস্তুত রেখেছিলেন।
তাঁর কন্যা আসমা (রা.) সফরের খাবার বাঁধার জন্য নিজের কোমরবন্ধ ছিঁড়ে দুই ভাগ করলেন। এ কারণে তাঁর উপাধি হয় “যাতুন নিতাকাইন” (দুই কোমরবন্ধওয়ালি) (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯০৫)।
সাওর গুহায় তিন রাত
নবীজি ﷺ ও আবু বকর (রা.) সাওর পাহাড়ের গুহায় তিন রাত আত্মগোপন করে থাকেন। আবু বকর (রা.)-এর পুত্র আব্দুল্লাহ দিনে মক্কায় থেকে কুরাইশদের খবর সংগ্রহ করতেন, আর রাতে এসে তাঁদের জানাতেন। তাঁর মুক্ত দাস আমির ইবনু ফুহাইরা ছাগল চরিয়ে গুহার কাছে নিয়ে আসতেন, যাতে তাঁরা দুধ পান করতে পারেন এবং পায়ের চিহ্ন মুছে যায়। আর পথ দেখানোর জন্য একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক ভাড়া করা হয়েছিল (সহিহ বুখারি ৩৯০৫)।
শিক্ষা: আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা ছিল, তবু নবীজি ﷺ প্রতিটি দিক সতর্কভাবে পরিকল্পনা করেছেন। তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়।
“আমাদের তৃতীয়জন আল্লাহ”
আবু বকর (রা.) বলেন, আমরা গুহায় থাকা অবস্থায় ওপরে মুশরিকদের পা দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবে আমাদের দেখে ফেলবে। নবীজি ﷺ বললেন: “হে আবু বকর, এমন দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাঁদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ?”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬৫৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮১
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
“তোমরা যদি তাঁকে সাহায্য না করো, তবে (জেনে রাখো) আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফিররা তাঁকে বের করে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তাঁরা দুজন গুহায় ছিলেন, আর তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন: দুঃখ কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
সূরা আত-তাওবা ৯:৪০
সুরাকার পিছু ধাওয়া
কুরাইশরা নবীজিকে ﷺ ধরে দেওয়ার জন্য বিরাট পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। সুরাকা ইবনু মালিক ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের পিছু নিলেন। কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছালে তাঁর ঘোড়ার পা বারবার মাটিতে দেবে যেতে লাগল। শেষে তিনি নিরাপত্তা চাইলেন এবং ফিরে গিয়ে অন্যদেরও এ পথ থেকে ফিরিয়ে দিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯০৬)। পরবর্তীতে সুরাকা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
মদিনায় অভ্যর্থনা
বারা ইবনু আযিব (রা.) বলেন, নবীজির ﷺ আগমনে মদিনাবাসী যেভাবে আনন্দিত হয়েছিল, আমি তাদের আর কোনো কিছুতে এত আনন্দিত হতে দেখিনি (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯২৫)।
মসজিদে নববি নির্মাণ
মদিনায় পৌঁছে নবীজি ﷺ সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি বনু নাজ্জারের কাছে জমির দাম জানতে চাইলেন। তারা বলল, আমরা এর মূল্য আল্লাহর কাছেই চাই। এরপর সাহাবিদের সঙ্গে তিনি নিজে ইট বহন করে মসজিদ নির্মাণে অংশ নেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৪২৮)।
শিক্ষা: ইসলামি সমাজের কেন্দ্র মসজিদ। আর নেতা নিজে কাজে অংশ নিলে সবাই উৎসাহিত হয়।
আনসার ও মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্ব
নবীজি ﷺ আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রা.) ও সাদ ইবনুর রাবি (রা.)-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। সাদ (রা.) বললেন, আমি আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী, আমার সম্পদ দুই ভাগ করে অর্ধেক তোমাকে দিচ্ছি। আব্দুর রহমান (রা.) বললেন: আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন। আমাকে শুধু বাজারের পথ দেখিয়ে দাও। এরপর তিনি ব্যবসা করে অল্প দিনেই সচ্ছল হয়ে গেলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৭৮০ (সংক্ষেপিত)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৯:৪০ • সহিহ বুখারি: ৪২৮, ৩৬৫৩, ৩৭৮০, ৩৯০৫, ৩৯০৬, ৩৯২৫ • সহিহ মুসলিম: ২৩৮১ • তিরমিজি ৩৯২৫
Leave a Reply