আবু হুরায়রা (রা.) সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী। ইসলাম গ্রহণের পর মাত্র কয়েক বছর নবীজির ﷺ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষুধা ও দারিদ্র্য উপেক্ষা করে সর্বক্ষণ নবীজির ﷺ সঙ্গে থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। আজ আমরা যে হাদিসভান্ডার পাই, তার বড় একটি অংশ তাঁর মাধ্যমে এসেছে। সহিহ হাদিসের আলোকে তাঁর জীবন তুলে ধরা হলো।
- দাওস গোত্রের জন্য নবীজির ﷺ দোয়া
- এত হাদিস কীভাবে মুখস্থ করলেন
- নবীজির ﷺ দোয়ায় অসাধারণ স্মৃতিশক্তি
- জ্ঞানের প্রতি আগ্রহের স্বীকৃতি
- মায়ের হিদায়াতের জন্য অশ্রু
- ক্ষুধার্ত আহলুস সুফফা
দাওস গোত্রের জন্য নবীজির ﷺ দোয়া
তুফাইল ইবনু আমর আদ-দাওসি (রা.) এসে বললেন, দাওস গোত্র অবাধ্য হয়েছে, আপনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হিদায়াত দিন এবং তাদের নিয়ে আসুন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৯৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫২৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন এই দাওস গোত্রেরই সন্তান। নবীজির ﷺ বদদোয়ার বদলে হিদায়াতের দোয়ার ফলেই যেন উম্মত পেয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হাদিস বর্ণনাকারীকে।
এত হাদিস কীভাবে মুখস্থ করলেন
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মানুষ বলে আবু হুরায়রা অনেক বেশি হাদিস বর্ণনা করে। আসলে আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসায় ব্যস্ত থাকতেন, আর আনসার ভাইয়েরা নিজেদের সম্পদ দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি পেটের সামান্য খাবারে সন্তুষ্ট থেকে সব সময় নবীজির ﷺ সঙ্গে লেগে থাকতাম। তাঁরা যখন অনুপস্থিত থাকতেন, আমি উপস্থিত থাকতাম, আর তাঁরা যা ভুলে যেতেন, আমি তা মুখস্থ রাখতাম।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৮ (সংক্ষেপিত)
নবীজির ﷺ দোয়ায় অসাধারণ স্মৃতিশক্তি
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার কাছ থেকে অনেক হাদিস শুনি, কিন্তু ভুলে যাই। নবীজি ﷺ বললেন: “তোমার চাদর বিছিয়ে দাও।” আমি বিছিয়ে দিলাম। তিনি দুই হাত দিয়ে যেন কিছু তুলে তাতে রাখলেন, তারপর বললেন: “এটি জড়িয়ে নাও।” আমি তা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলাম। এরপর থেকে আমি আর কিছুই ভুলিনি।
সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৯
জ্ঞানের প্রতি আগ্রহের স্বীকৃতি
আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান কে হবে? নবীজি ﷺ বললেন: “হে আবু হুরায়রা, আমি ভেবেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার আগে আর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করবে না, কারণ আমি হাদিসের প্রতি তোমার আগ্রহ দেখেছি। কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে একনিষ্ঠ অন্তরে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৯
মায়ের হিদায়াতের জন্য অশ্রু
আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর মাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কিন্তু তিনি গ্রহণ করতেন না। একদিন তিনি নবীজি ﷺ সম্পর্কে কটু কথা বললেন। আবু হুরায়রা (রা.) কাঁদতে কাঁদতে নবীজির ﷺ কাছে এসে মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দিন।” ঘরে ফিরে তিনি দেখলেন, তাঁর মা গোসল করে কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে তিনি নবীজির ﷺ কাছে ফিরে গেলেন এবং দোয়া চাইলেন, যেন আল্লাহ মুমিনদের অন্তরে তাঁর ও তাঁর মায়ের প্রতি ভালোবাসা দান করেন। নবীজি ﷺ সে দোয়াও করলেন।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৯১ (সংক্ষেপিত)
ক্ষুধার্ত আহলুস সুফফা
আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন “আহলুস সুফফা”র অন্যতম সদস্য। তাঁরা ছিলেন মসজিদে নববিতে অবস্থানকারী দরিদ্র সাহাবি, যাঁদের পরিবার বা সম্পদ ছিল না। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন, কখনো ক্ষুধার তীব্রতায় তিনি পেটে পাথর বাঁধতেন। একদিন নবীজি ﷺ তাঁর অবস্থা বুঝে এক পেয়ালা দুধ এনে প্রথমে সুফফার সবাইকে পান করালেন, তারপর আবু হুরায়রাকে তৃপ্তি সহকারে পান করালেন, আর সবশেষে নিজে পান করলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৫২)।
📚 তথ্যসূত্র
সহিহ বুখারি: ৯৯, ১১৮, ১১৯, ২৯৩৭, ৬৪৫২ • সহিহ মুসলিম: ২৪৯১, ২৫২৪
Leave a Reply