দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর আখিরাতই চিরস্থায়ী আবাস। মৃত্যু, কবর, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি বিশ্বাস মুমিনকে সতর্ক ও আশাবাদী রাখে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আখিরাতের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
- প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ নেবে
- দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো থাকো
- মৃত্যুর পর যা সঙ্গে যায়
- বিচার দিবসের প্রশ্ন
- অণু পরিমাণ আমলেরও হিসাব
- জান্নাতের নিয়ামত ও আশ্রয় প্রার্থনা
প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ নেবে
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۖ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ ۗ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
“প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফল। আর দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছু নয়।”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫
মৃত্যু উপস্থিত হলে কেউ কেউ বলবে, হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি যা ছেড়ে এসেছি। কিন্তু তা কখনো হবে না (সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৯৯–১০০)।
দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো থাকো
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ
“দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত মানুষ অথবা পথিক।” ইবনু উমর (রা.) বলতেন: সন্ধ্যা হলে সকালের অপেক্ষা কোরো না, আর সকাল হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা কোরো না। সুস্থতার সময় অসুস্থতার জন্য এবং জীবিত থাকতে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নাও।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১৬ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
মৃত্যুর পর যা সঙ্গে যায়
“মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তিনটি জিনিস যায়: তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। এর মধ্যে দুটি ফিরে আসে, আর একটি থেকে যায়। পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, আর আমল থেকে যায়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫১৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৬০ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়, এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
বিচার দিবসের প্রশ্ন
“কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা ততক্ষণ সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে: তার জীবন সে কীসে শেষ করেছে, তার জ্ঞান অনুযায়ী সে কী আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় খরচ করেছে, এবং তার শরীর সে কীসে ক্ষয় করেছে।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ২৪১৭ (ইমাম তিরমিজি: হাসান সহিহ) — আবু বারযা আল-আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত
অণু পরিমাণ আমলেরও হিসাব
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে সে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে সেটিও দেখতে পাবে।”
সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৭–৮
কিয়ামতের দিন আল্লাহ ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন। কারও প্রতি সামান্যতম জুলুমও করা হবে না। সরিষার দানা পরিমাণ আমলও হিসাবে আনা হবে (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭)।
জান্নাতের নিয়ামত ও আশ্রয় প্রার্থনা
আল্লাহ তাআলা বলেন: “আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন কিছু প্রস্তুত রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে কল্পনাও আসেনি।” এর সমর্থনে সূরা আস-সাজদা ৩২:১৭ পড়ে দেখো।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৪৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮২৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের আজাব থেকে, কবরের আজাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে, এবং মাসিহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।” নবীজি ﷺ শেষ তাশাহহুদের পর এই চারটি বিষয় থেকে আশ্রয় চাইতে বলেছেন।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৮ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩:১৮৫, ২১:৪৭, ২৩:৯৯–১০০, ৩২:১৭, ৯৯:৭–৮ • সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৬৪১৬, ৬৫১৪ • সহিহ মুসলিম: ৫৮৮, ১৬৩১, ২৮২৪, ২৯৬০ • তিরমিজি ২৪১৭
Leave a Reply