হালাল উপার্জন ইবাদত কবুল হওয়ার একটি শর্ত। আবার সুদ, প্রতারণা ও অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে লেনদেন ও উপার্জনের মূলনীতি তুলে ধরা হলো।
- হালাল ও পবিত্র রিজিক
- হালাল-হারাম ও সন্দেহজনক বিষয়
- হারাম উপার্জনে দোয়া কবুল হয় না
- সুদের ভয়াবহতা
- ব্যবসায় সততা
- নিজ হাতের উপার্জনের মর্যাদা
হালাল ও পবিত্র রিজিক
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ
“হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে খাও। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।”
সূরা আল-বাকারা ২:১৬৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।”
সূরা আন-নিসা ৪:২৯
হালাল-হারাম ও সন্দেহজনক বিষয়
“হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। এ দুইয়ের মাঝে রয়েছে কিছু সন্দেহজনক বিষয়, যা অনেক মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে লিপ্ত হয়, সে হারামে পতিত হয়।” একই হাদিসের শেষে আছে: “জেনে রাখো, শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক থাকে, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটি হলো অন্তর (কলব)।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৯ — নুমান ইবনু বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত
হারাম উপার্জনে দোয়া কবুল হয় না
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” এরপর নবীজি ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, তার চুল এলোমেলো ও শরীর ধুলোমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে রব, হে রব! অথচ তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, এবং হারাম দিয়েই তার শরীর গঠিত হয়েছে। তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
সুদের ভয়াবহতা
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”
সূরা আল-বাকারা ২:২৭৫
সূরা আল-বাকারা ২:২৭৮–২৭৯-এ আল্লাহ মুমিনদের অবশিষ্ট সুদ ছেড়ে দিতে বলেছেন। যদি তারা না ছাড়ে, তবে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা।
জাবির (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ লানত করেছেন সুদখোরের ওপর, সুদদাতার ওপর, সুদের লেখকের ওপর এবং সুদের দুই সাক্ষীর ওপর। তিনি বলেছেন: “তারা সবাই (গুনাহে) সমান।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮
ব্যবসায় সততা
“ক্রেতা ও বিক্রেতা আলাদা না হওয়া পর্যন্ত তাদের (চুক্তি বাতিলের) এখতিয়ার থাকে। যদি তারা সত্য বলে এবং (পণ্যের দোষ-গুণ) স্পষ্ট করে, তবে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা গোপন করে ও মিথ্যা বলে, তবে তাদের লেনদেনের বরকত মুছে ফেলা হয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৩২ — হাকিম ইবনু হিযাম (রা.) থেকে বর্ণিত
নবীজি ﷺ বাজারে খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন, আঙুল ভিজে গেছে। জিজ্ঞেস করলেন, এ কী? বিক্রেতা বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। তিনি বললেন: “তাহলে ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
মাপে ও ওজনে কম দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য কুরআনে ধ্বংসের সতর্কবাণী এসেছে (সূরা আল-মুতাফফিফিন ৮৩:১–৩)।
নিজ হাতের উপার্জনের মর্যাদা
“নিজ হাতে কাজ করে উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৭২ — মিকদাম ইবনু মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:১৬৮, ২:২৭৫, ২:২৭৮–২৭৯, ৪:২৯, ৮৩:১–৩ • সহিহ বুখারি: ৫২, ২০৭২, ২০৭৯ • সহিহ মুসলিম: ১০২, ১০১৫, ১৫৩২, ১৫৯৮, ১৫৯৯
Leave a Reply