জুয়া এমন উপার্জন, যেখানে একজনের লাভ মানে অন্যের নিশ্চিত ক্ষতি, আর তা নির্ভর করে শ্রম নয়, ভাগ্যের ওপর। কুরআন একে মদের সঙ্গে একত্রে শয়তানের কাজ বলেছে। আর নবীজি ﷺ এমন সব লেনদেন নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে অস্পষ্টতা ও প্রতারণার ঝুঁকি (গারার) থাকে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
- জুয়া শয়তানের কাজ
- জুয়ার আসল উদ্দেশ্য: শত্রুতা ও উদাসীনতা
- সামান্য উপকার, বড় ক্ষতি
- জুয়ার আমন্ত্রণ দিলেও কাফফারা
- গারার: অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন
- পাকার আগে ফল বিক্রি
- মূলনীতি: পারস্পরিক সম্মতি ও স্বচ্ছতা
জুয়া শয়তানের কাজ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি-বেদি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো বর্জন করো, যাতে সফল হতে পারো।”
সূরা আল-মায়িদা ৫:৯০
জুয়ার আসল উদ্দেশ্য: শত্রুতা ও উদাসীনতা
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
“শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে, এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে?”
সূরা আল-মায়িদা ৫:৯১
জুয়ার আসক্তি পরিবার ধ্বংস করে, ঋণের জালে জড়ায়, আর মানুষকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আয়াতটি এ বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।
সামান্য উপকার, বড় ক্ষতি
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا
“তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এ দুটিতে রয়েছে বড় গুনাহ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও। তবে এ দুটির গুনাহ উপকারের চেয়ে অনেক বড়।”
সূরা আল-বাকারা ২:২১৯
জুয়ার আমন্ত্রণ দিলেও কাফফারা
“…আর যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, ‘এসো, তোমার সঙ্গে জুয়া খেলি’, সে যেন (কাফফারা হিসেবে) কিছু সদকা করে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৪৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
শুধু জুয়ার আমন্ত্রণ দেওয়ার জন্যই যদি সদকার নির্দেশ থাকে, তবে বাস্তবে জুয়া খেলার গুনাহ কত বড়, তা সহজেই বোঝা যায়।
গারার: অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ، وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ
“আল্লাহর রাসুল ﷺ পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে বেচাকেনা এবং অনিশ্চয়তাপূর্ণ (গারার) বেচাকেনা নিষিদ্ধ করেছেন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫১৩ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
“গারার” মানে এমন লেনদেন, যেখানে পণ্যের অস্তিত্ব, পরিমাণ, মান বা হস্তান্তর অনিশ্চিত, ফলে এক পক্ষের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন পানিতে থাকা মাছ বা উড়ন্ত পাখি বিক্রি করা, অথবা ঢিল ছুড়ে যে জিনিসে লাগবে তা বিক্রি করা।
পাকার আগে ফল বিক্রি
ইবনু উমর (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ ফল পাকা (খাওয়ার উপযোগী হওয়া) স্পষ্ট হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়কে নিষেধ করেছেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ২১৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৩৪
কারণ পাকার আগে ফল নষ্ট হয়ে গেলে ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর বিক্রেতা বিনিময় ছাড়াই অর্থ নেবে। এ নিষেধাজ্ঞা গারারের একটি বাস্তব উদাহরণ।
মূলনীতি: পারস্পরিক সম্মতি ও স্বচ্ছতা
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ
“তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।”
সূরা আন-নিসা ৪:২৯
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:২১৯, ৪:২৯, ৫:৯০–৯১ • সহিহ বুখারি: ২১৯৪, ৪৮৬০ • সহিহ মুসলিম: ১৫১৩, ১৫৩৪, ১৬৪৭
Leave a Reply