আয়াতুল কুরসি কুরআনের সবচেয়ে মহান আয়াত। মাত্র একটি আয়াতে আল্লাহর একত্ব, চিরঞ্জীবতা, সর্বময় ক্ষমতা, অসীম জ্ঞান ও মহত্ত্বের এমন পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা এসেছে, যা হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রতি ভরসা জাগায়। বাক্য ধরে ধরে আয়াতুল কুরসির অর্থ ও শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- পূর্ণ আয়াত
- কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত
- বাক্যভিত্তিক অর্থ ও শিক্ষা
- ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি
পূর্ণ আয়াত
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তন্দ্রা ও ঘুম তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা আছে তিনি জানেন। তিনি যতটুকু চান তার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে। এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ, মহান।”
সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫
কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত
নবীজি ﷺ উবাই ইবনু কাব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে থাকা আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মহান? তিনি বললেন: “আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম।” নবীজি ﷺ তাঁর বুকে হাত দিয়ে বললেন: “হে আবুল মুনযির, এই জ্ঞান তোমার জন্য আনন্দদায়ক হোক।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১০
বাক্যভিত্তিক অর্থ ও শিক্ষা
১. “আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই”
আয়াতের শুরুতেই তাওহিদের ঘোষণা। ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। বাকি পুরো আয়াত এই দাবির প্রমাণ।
২. “আল-হাইয়ু আল-কাইয়ুম”: চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক
তাঁর জীবন কারও কাছ থেকে পাওয়া নয় এবং তার কোনো শেষ নেই। আর “কাইয়ুম” মানে তিনি নিজে কারও মুখাপেক্ষী নন, অথচ সমগ্র সৃষ্টি প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর ওপর নির্ভরশীল। আলেমগণ বলেছেন, এ দুটি নাম আল্লাহর সব গুণাবলির মূল।
৩. “তন্দ্রা ও ঘুম তাঁকে স্পর্শ করে না”
মানুষ ক্লান্ত হয়, ঘুমায়, অসতর্ক হয়। কিন্তু আল্লাহ এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর সৃষ্টি থেকে গাফিল নন। তাই রাতের অন্ধকারে বা একাকীত্বেও মুমিন নিরাপদ বোধ করে।
৪. “আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর”
আমাদের সম্পদ, শরীর, পরিবার সবই আসলে আল্লাহর আমানত। এই উপলব্ধি অহংকার দূর করে এবং হারানোর কষ্টে সান্ত্বনা দেয়।
৫. “কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে?”
তাঁর রাজত্বে কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া মুখ খোলার সাহস রাখে না। কিয়ামতের দিনের সুপারিশও হবে কেবল তাঁর অনুমতিতে এবং যাঁর প্রতি তিনি সন্তুষ্ট তাঁর জন্য (সূরা আন-নাজম ৫৩:২৬)।
৬. “তাদের সামনে ও পেছনে যা আছে তিনি জানেন”
অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, প্রকাশ্য ও গোপন, সবকিছু তাঁর জ্ঞানের আওতায়। আর মানুষ তাঁর জ্ঞানের ততটুকুই জানতে পারে, যতটুকু তিনি জানাতে চান।
৭. “তাঁর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে”
এ বাক্য আল্লাহর রাজত্ব ও মহত্ত্বের বিশালতা বোঝায়। আমাদের কাছে যে আকাশ ও পৃথিবী বিশাল, তা তাঁর কুরসির তুলনায় ক্ষুদ্র। এই সৃষ্টির প্রকৃত রূপ আমরা জানি না, আর তা আল্লাহর সৃষ্টির মতো নয়।
৮. “এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না”
সমগ্র মহাবিশ্ব পরিচালনা করতে আল্লাহর কোনো কষ্ট বা ক্লান্তি হয় না। তাহলে আমাদের ছোট্ট প্রয়োজন পূরণ করা তাঁর কাছে কতই না সহজ!
৯. “তিনি সর্বোচ্চ, মহান”
আয়াতের সমাপ্তি দুটি নাম দিয়ে: আল-আলিয়্যু (সর্বোচ্চ) ও আল-আযিম (মহান)। তাঁর মর্যাদা, ক্ষমতা ও অবস্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি
আবু হুরায়রা (রা.)-এর এক দীর্ঘ ঘটনায় এসেছে, ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকে এবং শয়তান কাছে আসতে পারে না। নবীজি ﷺ এ কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩১১, ৫০১০ (ইমাম বুখারি তালিক সূত্রে এনেছেন; অন্য সূত্রে মুত্তাসিল)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:২৫৫, ৫৩:২৬ • সহিহ বুখারি: ২৩১১, ৫০১০ • সহিহ মুসলিম: ৮১০
Leave a Reply