মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, আর দ্বীনের মূল ভিত্তি কী — এই দুই প্রশ্নের উত্তর দিয়েই ইসলাম বোঝা শুরু হয়। এই লেখায় কুরআনের আয়াত এবং বিখ্যাত “হাদিসে জিবরিল”-এর আলোকে ঈমান, ইসলাম ও ইহসানের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
- মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য
- তাওহিদ: আল্লাহর একত্ব
- হাদিসে জিবরিল: দ্বীনের তিন স্তর
- ঈমানের ছয় রুকন
- ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ
- ঈমানের শাখা-প্রশাখা
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।”
সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬
ইবাদত মানে শুধু নামাজ-রোজা নয়। আল্লাহর আদেশ মেনে চলা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে পুরো জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য পরিচালিত করাই ইবাদত।
তাওহিদ: আল্লাহর একত্ব
ইসলামের সবচেয়ে মৌলিক বিশ্বাস হলো তাওহিদ। অর্থাৎ আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। সূরা আল-ইখলাস এই বিশ্বাসকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছে:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”
সূরা আল-ইখলাস ১১২:১–৪
হাদিসে জিবরিল: দ্বীনের তিন স্তর
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন সাদা কাপড় পরা ও কালো চুলের এক ব্যক্তি নবীজির ﷺ কাছে এসে বসলেন। তাঁর গায়ে সফরের কোনো চিহ্ন ছিল না, আর সাহাবিদের কেউ তাঁকে চিনতেনও না। তিনি ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর নবীজি ﷺ জানালেন, ইনি ছিলেন জিবরিল (আ.), তিনি তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
ইহসান সম্পর্কে নবীজি ﷺ বললেন: “তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে না-ও দেখো, তবে তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮ — উমর (রা.) থেকে; অনুরূপ বর্ণনা সহিহ বুখারি ৫০ (আবু হুরায়রা রা. থেকে)
ঈমানের ছয় রুকন
একই হাদিসে ঈমানের পরিচয় দিতে গিয়ে নবীজি ﷺ বলেছেন:
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
“তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলদের প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি, এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮
- আল্লাহর প্রতি ঈমান: তাঁর অস্তিত্ব, রুবুবিয়াত (প্রতিপালন), উলুহিয়াত (একমাত্র উপাস্য হওয়া) এবং তাঁর নাম ও গুণাবলিতে বিশ্বাস।
- ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান: নূরের তৈরি আল্লাহর অনুগত সৃষ্টি, যাঁরা তাঁর আদেশ পালন করেন।
- কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান: তাওরাত, যাবুর, ইনজিল ও সর্বশেষ কিতাব আল-কুরআন।
- রাসুলদের প্রতি ঈমান: প্রথম রাসুল নুহ (আ.) থেকে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত সবার প্রতি (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪০)।
- শেষ দিবসের প্রতি ঈমান: মৃত্যু, কবর, পুনরুত্থান, হিসাব, জান্নাত ও জাহান্নাম।
- তাকদিরের প্রতি ঈমান: ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছার অধীন।
কুরআনেও এই রুকনগুলো একসঙ্গে এসেছে। সূরা আন-নিসা ৪:১৩৬-এ আল্লাহ মুমিনদের আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনার আদেশ দিয়েছেন, এবং সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল ও শেষ দিবসকে অস্বীকার করে, সে ঘোর পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।
ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
“ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত: এ সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল; সালাত কায়েম করা; যাকাত দেওয়া; হজ করা; এবং রমজানের রোজা রাখা।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
ঈমানের শাখা-প্রশাখা
“ঈমানের ষাটের অধিক (মুসলিমের বর্ণনায় সত্তরের অধিক) শাখা রয়েছে। এর সর্বোচ্চটি হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, সর্বনিম্নটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৫ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঈমান শুধু অন্তরের বিশ্বাস নয়। এতে মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলও অন্তর্ভুক্ত। এমনকি রাস্তা থেকে কাঁটা সরানোর মতো ছোট্ট একটি ভালো কাজও ঈমানের অংশ।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৫১:৫৬, ১১২:১–৪, ৪:১৩৬, ৩৩:৪০ • সহিহ বুখারি: ৮, ৯, ৫০ • সহিহ মুসলিম: ৮, ১৬, ৩৫ — নম্বর পদ্ধতির জন্য দেখুন রেফারেন্স নীতিমালা।
Leave a Reply