আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা নবী-রাসুলদের কাজ। নবুওয়াতের ধারা শেষ হয়েছে, কিন্তু দাওয়াতের দায়িত্ব এখন উম্মতের কাঁধে। প্রত্যেক মুসলিম নিজের জ্ঞান ও সামর্থ্য অনুযায়ী এ দায়িত্বের অংশীদার। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব ও ফজিলত তুলে ধরা হলো।
- সবচেয়ে উত্তম কথা
- দাওয়াত নবী ও তাঁর অনুসারীদের পথ
- শ্রেষ্ঠ উম্মতের বৈশিষ্ট্য
- একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও
- দাওয়াতের অপরিমেয় সওয়াব
- অন্যায় দেখলে করণীয়
সবচেয়ে উত্তম কথা
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“কথায় তার চেয়ে উত্তম আর কে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নিজে সৎকাজ করে এবং বলে: আমি তো মুসলিমদের একজন।”
সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৩
দাওয়াত নবী ও তাঁর অনুসারীদের পথ
قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
“বলুন, এটিই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে ডাকি সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে, আমি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তারাও।”
সূরা ইউসুফ ১২:১০৮
এ আয়াত থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, দাওয়াত নবীজির ﷺ অনুসারীদেরও কাজ। দুই, দাওয়াত হতে হবে “বাসিরাত” অর্থাৎ সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে। তাই যে বিষয় জানা নেই, সে বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়।
শ্রেষ্ঠ উম্মতের বৈশিষ্ট্য
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।”
সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪
আল্লাহ এই উম্মতকে বলেছেন “শ্রেষ্ঠ উম্মত”, যাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো (সূরা আলে ইমরান ৩:১১০)।
একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে (মানুষের কাছে) পৌঁছে দাও, একটি আয়াত হলেও।” একই হাদিসের শেষে নবীজি ﷺ সতর্ক করেছেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৬১ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত
এ হাদিসে দাওয়াতের জন্য উৎসাহ এবং সতর্কতা দুটোই আছে। দ্বীনের যা জানি, তা পৌঁছে দেব। কিন্তু যাচাই না করে কোনো কথা নবীজির ﷺ নামে প্রচার করব না। বিদায় হজের ভাষণেও নবীজি ﷺ বলেছিলেন: “উপস্থিতরা যেন অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেয়” (সহিহ বুখারি ৬৭; সহিহ মুসলিম ১৬৭৯)।
দাওয়াতের অপরিমেয় সওয়াব
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
“যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, সে ওই কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পায়।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৯৩ — আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত
“যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে, অথচ অনুসারীদের সওয়াব একটুও কমবে না।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৭৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
খায়বারের দিন নবীজি ﷺ আলি (রা.)-কে বলেছিলেন: “আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে আল্লাহ যদি একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের (সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের) চেয়েও উত্তম।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩০০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪০৬ — সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত
অন্যায় দেখলে করণীয়
“তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে। যদি তা-ও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে (ঘৃণা করে)। আর এটি ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৯ — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত
আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, “হাত দিয়ে প্রতিহত করা” মূলত তাদের দায়িত্ব যাদের সে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আছে, যেমন অভিভাবক তার পরিবারে বা প্রশাসন তার এখতিয়ারে। শর্ত হলো, এতে যেন বড় কোনো ফিতনা বা ক্ষতি সৃষ্টি না হয়।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩:১০৪, ৩:১১০, ১২:১০৮, ৪১:৩৩ • সহিহ বুখারি: ৬৭, ৩০০৯, ৩৪৬১ • সহিহ মুসলিম: ৪৯, ১৬৭৯, ১৮৯৩, ২৪০৬, ২৬৭৪
Leave a Reply