☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা শুধু ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়, এর জন্য দরকার সঠিক কৌশল ও আল্লাহর সাহায্য। চোখ ও জিহ্বার হেফাজত, ভালো সঙ্গ, গুনাহের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, এবং গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নেক আমল, এগুলোই কুরআন-সুন্নাহর শেখানো পথ। দলিলসহ সেগুলো তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. চেষ্টাকারীকে আল্লাহ পথ দেখান
  2. দৃষ্টির হেফাজত
  3. জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদারি
  4. গুনাহকে ছোট মনে না করা
  5. সঙ্গ বাছাই
  6. গুনাহের পরপরই নেক আমল
  7. নফল ইবাদতে আল্লাহর ভালোবাসা

চেষ্টাকারীকে আল্লাহ পথ দেখান

কুরআন

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ

“আর যারা আমার পথে প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখিয়ে দেব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।”

সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৬৯

দৃষ্টির হেফাজত

কুরআন

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”

সূরা আন-নূর ২৪:৩০ — পরের আয়াতে (২৪:৩১) মুমিন নারীদেরও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাদিস

জারির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি নবীজিকে ﷺ হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে আদেশ দিলেন, যেন আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিই।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৫৯

অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত প্রথম দৃষ্টিতে গুনাহ নেই, কিন্তু তা দীর্ঘ করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে আবার তাকানো উচিত নয়। আজকের যুগে মোবাইল ও ইন্টারনেটের পর্দাও এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদারি

হাদিস

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ

“যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মাঝের অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মাঝের অঙ্গ (লজ্জাস্থান) হেফাজতের জিম্মাদারি দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৭৪ — সাহল ইবনু সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত

গুনাহকে ছোট মনে না করা

হাদিস

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন: “মুমিন তার গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর ভয় করছে পাহাড়টি তার ওপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী তার গুনাহকে দেখে নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি মাছির মতো, যা সে হাত নেড়ে তাড়িয়ে দেয়।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩০৮

সঙ্গ বাছাই

হাদিস

“সৎসঙ্গী ও অসৎসঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। সুগন্ধি বিক্রেতা হয় তোমাকে কিছু সুগন্ধি উপহার দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে কিনবে, অথবা অন্তত তার সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২১০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৮ — আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের (জীবনধারার) ওপর থাকে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকে যেন খেয়াল করে, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৮৩৩; জামে তিরমিজি, হাদিস ২৩৭৮ (হাসান) — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

গুনাহের পরপরই নেক আমল

কুরআন

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ

“নিশ্চয়ই সৎকর্ম অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়।”

সূরা হুদ ১১:১১৪

হাদিস

اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ

“তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো। কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে তার পরপরই একটি ভালো কাজ করো, তা মন্দটিকে মুছে দেবে। আর মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।”

জামে তিরমিজি, হাদিস ১৯৮৭ (হাসান সহিহ) — আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত

নফল ইবাদতে আল্লাহর ভালোবাসা

হাদিসে কুদসি

আল্লাহ বলেন: “আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভ করে সবচেয়ে বেশি সেই আমলের মাধ্যমে, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। আর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে, পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তাকে দিই, আর আশ্রয় চাইলে অবশ্যই আশ্রয় দিই।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫০২ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ বান্দার শোনা, দেখা ও চলাফেরাকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করেন, ফলে বান্দা গুনাহ থেকে সুরক্ষিত থাকে।

গুনাহ থেকে বাঁচার কৌশল: যে পরিবেশ, অ্যাপ বা সঙ্গ গুনাহের দিকে টানে, তা থেকে দূরে থাকুন। একাকীত্বে আল্লাহর উপস্থিতি স্মরণ করুন। ফরজ ঠিক রেখে নফল বাড়ান। আর পদস্খলন হলে হতাশ না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা ও নেক আমল করুন।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ১১:১১৪, ২৪:৩০–৩১, ২৯:৬৯ • সহিহ বুখারি: ২১০১, ৬৩০৮, ৬৪৭৪, ৬৫০২ • সহিহ মুসলিম: ২১৫৯, ২৬২৮ • আবু দাউদ ৪৮৩৩ • তিরমিজি: ১৯৮৭, ২৩৭৮

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *