☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

হাশরের ময়দান: কিয়ামতের দিনের দৃশ্য

কিয়ামতের দিন সব মানুষকে এক ময়দানে একত্র করা হবে। সূর্য খুব কাছে চলে আসবে, প্রত্যেকে নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে, আর আমলনামা হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই কঠিন দিনেও কিছু মানুষ থাকবে আল্লাহর ছায়ায়, আর কেউ পান করবে হাউজে কাওসারের পানি। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে হাশরের ময়দানের বিবরণ তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. কিয়ামতের প্রকম্পন
  2. যেভাবে মানুষকে একত্র করা হবে
  3. সূর্যের নৈকট্য ও ঘাম
  4. প্রত্যেকে নিজের চিন্তায়
  5. যারা আল্লাহর ছায়া পাবে
  6. আমলনামা
  7. হাউজে কাওসার

কিয়ামতের প্রকম্পন

কুরআন

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ

“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।”

সূরা আল-হজ ২২:১ — পরের আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন দুধদানকারী মা তার শিশুকে ভুলে যাবে, আর গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে।

যেভাবে মানুষকে একত্র করা হবে

হাদিস

“কিয়ামতের দিন মানুষকে খালি পায়ে, বস্ত্রহীন ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্র করা হবে।” আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকাবে? নবীজি ﷺ বললেন: “হে আয়েশা, সেদিনের পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হবে যে কেউ কারও দিকে তাকানোর কথা ভাববেও না।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫২৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৫৯

সূর্যের নৈকট্য ও ঘাম

হাদিস

“কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির খুব কাছে আনা হবে, এমনকি তা তাদের থেকে এক মাইল দূরত্বে থাকবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে। কারও ঘাম গোড়ালি পর্যন্ত, কারও হাঁটু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত, আর কারও ঘাম মুখ পর্যন্ত লাগাম হয়ে থাকবে।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৬৪ — মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত

প্রত্যেকে নিজের চিন্তায়

কুরআন

يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ۝ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ۝ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ۝ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ

“সেদিন মানুষ পালিয়ে বেড়াবে তার ভাই থেকে, তার মা ও বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তান থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন অবস্থা হবে, যা তাকে অন্যদের থেকে ব্যস্ত রাখবে।”

সূরা আবাসা ৮০:৩৪–৩৭

যারা আল্লাহর ছায়া পাবে

হাদিস

“যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন:

  1. ন্যায়পরায়ণ শাসক;
  2. যে যুবক আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে উঠেছে;
  3. যে ব্যক্তির অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলে থাকে;
  4. যে দুজন আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তাঁরই জন্য মিলিত হয় এবং তাঁরই জন্য পৃথক হয়;
  5. যে ব্যক্তিকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী (অবৈধ কাজে) আহ্বান করে, আর সে বলে: আমি আল্লাহকে ভয় করি;
  6. যে ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী দান করল;
  7. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৩১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

আমলনামা

কুরআন

فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ

“অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে (আনন্দে) বলবে: এসো, আমার আমলনামা পড়ে দেখো!”

সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:১৯

অপরাধীরা তাদের আমলনামা দেখে ভীত হয়ে বলবে: হায়, আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন আমলনামা, যা ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি, সবকিছুই লিখে রেখেছে! আর তারা যা করেছে, সবই সামনে উপস্থিত পাবে (সূরা আল-কাহফ ১৮:৪৯)।

হাউজে কাওসার

হাদিস

“আমার হাউজ (প্রশস্ততায়) এক মাসের পথ। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, এর ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধিময়, আর এর পানপাত্রগুলো আকাশের তারার মতো অসংখ্য। যে একবার এর পানি পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৯২ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত

সেই কঠিন দিনে মানুষ সুপারিশের জন্য নবীদের কাছে যাবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর অনুমতিতে সব মানুষের জন্য মহান সুপারিশ করবেন (সহিহ বুখারি ৪৭১২; সহিহ মুসলিম ১৯৪)।

সেদিনের প্রস্তুতি: সাত শ্রেণির তালিকাটি আবার পড়ুন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কোন শ্রেণিতে পড়ার চেষ্টা করছি? যুবক হলে ইবাদতে বেড়ে উঠুন, মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন, গোপনে দান করুন, আর নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে কাঁদুন।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ১৮:৪৯, ২২:১–২, ৬৯:১৯, ৮০:৩৪–৩৭ • সহিহ বুখারি: ৬৬০, ৪৭১২, ৬৫২৭, ৬৫৭৯ • সহিহ মুসলিম: ১৯৪, ১০৩১, ২২৯২, ২৮৫৯, ২৮৬৪

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *