☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

ইসলামের আলোকে সন্তান প্রতিপালন

সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাদের সঠিক দ্বীনি শিক্ষা, স্নেহ-ভালোবাসা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে প্রতিপালন করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব। আর নেক সন্তান মৃত্যুর পরও বাবা-মায়ের জন্য সওয়াবের উৎস। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সন্তান প্রতিপালনের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায়
  2. জন্মের পর: আকিকা ও সুন্দর নাম
  3. নামাজের শিক্ষা
  4. লুকমান (আ.)-এর উপদেশ
  5. স্নেহ ও ভালোবাসা
  6. সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার
  7. নেক সন্তানের জন্য দোয়া

প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মায়

হাদিস

“প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের (স্বভাবধর্ম ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৫৮ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের চিন্তা ও বিশ্বাস গঠনে বাবা-মা ও পরিবেশের ভূমিকা সবচেয়ে বড়।

জন্মের পর: আকিকা ও সুন্দর নাম

হাদিস

“প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে (পশু) জবাই করা হবে, তার মাথা মুণ্ডন করা হবে এবং তার নাম রাখা হবে।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৮৩৮; জামে তিরমিজি, হাদিস ১৫২২ (সহিহ) — সামুরা ইবনু জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত; আরও দেখুন সহিহ বুখারি ৫৪৭২

হাদিস

“আল্লাহর কাছে তোমাদের নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৩২ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত

নামাজের শিক্ষা

কুরআন

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا

“আর আপনার পরিবারকে নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকুন।”

সূরা ত্বাহা ২০:১৩২

হাদিস

“তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও। দশ বছর হলে (নামাজে অবহেলার জন্য) শাসন করো, এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫ (শাইখ আলবানি: হাসান সহিহ) — আমর ইবনু শুআইব তাঁর পিতা ও দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন

আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে শাসন মানে আঘাত দিয়ে কষ্ট দেওয়া নয়। বরং মুখমণ্ডল এড়িয়ে, আঘাতের চিহ্ন না রেখে মৃদুভাবে সতর্ক করা। আসল লক্ষ্য হলো সন্তানের মধ্যে নামাজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা।

লুকমান (আ.)-এর উপদেশ

কুরআন

يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ

“হে আমার প্রিয় পুত্র, নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো, এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধরো।”

সূরা লুকমান ৩১:১৭

সূরা লুকমান ৩১:১৩–১৯ আয়াতগুলো সন্তান প্রতিপালনের একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রম। এতে আছে শিরক থেকে বাঁচা, বাবা-মায়ের হক, আল্লাহর সর্বজ্ঞতার প্রতি বিশ্বাস, নামাজ, সৎকাজের আদেশ, ধৈর্য, অহংকার না করা, এবং নম্রভাবে চলা ও কথা বলার শিক্ষা।

স্নেহ ও ভালোবাসা

হাদিস

নবীজি ﷺ হাসান ইবনু আলি (রা.)-কে চুমু খেলেন। পাশে বসা আকরা ইবনু হাবিস বললেন, আমার দশটি সন্তান আছে, আমি কখনো তাদের কাউকে চুমু খাইনি। নবীজি ﷺ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন: “যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩১৮ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার

হাদিস

নুমান ইবনু বাশির (রা.)-এর বাবা তাঁকে একটি উপহার দিয়ে নবীজিকে ﷺ সাক্ষী রাখতে চাইলেন। নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এমন দিয়েছ? তিনি বললেন, না। নবীজি ﷺ বললেন: “আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৩

নেক সন্তানের জন্য দোয়া

কুরআনি দোয়া

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

“হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন, এবং আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম (আদর্শ) বানিয়ে দিন।”

সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪

মৃত্যুর পর যে তিনটি আমলের সওয়াব জারি থাকে, তার একটি হলো নেক সন্তান, যে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১)।

প্রতিপালনের মূলমন্ত্র: সন্তান উপদেশের চেয়ে দেখে বেশি শেখে। তাই নিজে নামাজি, সত্যবাদী ও নম্র হোন। সন্তানের সঙ্গে নবীদের গল্প বলুন, ছোট ছোট দোয়া মুখস্থ করান, আর ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করুন।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২০:১৩২, ২৫:৭৪, ৩১:১৩–১৯ • সহিহ বুখারি: ১৩৮৫, ২৫৮৭, ৫৪৭২, ৫৯৯৭ • সহিহ মুসলিম: ১৬২৩, ১৬৩১, ২১৩২, ২৩১৮, ২৬৫৮ • আবু দাউদ: ৪৯৫, ২৮৩৮ • তিরমিজি ১৫২২

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *