☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

ঋণ ও আমানত: ইসলামের কঠোর নির্দেশনা

ঋণ ও আমানত দুটিই মানুষের হকের সঙ্গে জড়িত। শহিদের সব গুনাহ মাফ হয়, কিন্তু ঋণ মাফ হয় না। আর আমানতের খেয়ানত মুনাফিকের আলামত। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ঋণ নেওয়া-দেওয়া ও আমানত রক্ষার বিধান তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ
  2. ঋণ লিখে রাখা
  3. ঋণের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা
  4. পরিশোধে টালবাহানা জুলুম
  5. অভাবগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে ছাড় দেওয়া
  6. ঋণ থেকে মুক্তির দোয়া

আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ

কুরআন

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেবে।”

সূরা আন-নিসা ৪:৫৮

হাদিস

“মুনাফিকের আলামত তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আর তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৯ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

ঋণ লিখে রাখা

কুরআন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ

“হে মুমিনগণ, তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।”

সূরা আল-বাকারা ২:২৮২ — কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত, যা পুরোটাই লেনদেন ও সাক্ষী রাখার বিধান নিয়ে।

ঋণের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা

হাদিস

“শহিদের ঋণ ছাড়া সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৮৬ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

“যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ (ঋণ) নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন। আর যে আত্মসাতের নিয়তে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩৮৭ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

শুরুর দিকে নবীজি ﷺ ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির জানাজা নিজে না পড়িয়ে সাহাবিদের পড়তে বলতেন, যতক্ষণ না কেউ তার ঋণের দায়িত্ব নিতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ২২৮৯)।

পরিশোধে টালবাহানা জুলুম

হাদিস

مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ

“সামর্থ্যবান ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২২৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৬৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬০১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

অভাবগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে ছাড় দেওয়া

কুরআন

وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ ۚ وَأَن تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

“আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি (ঋণটি) মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।”

সূরা আল-বাকারা ২:২৮০

হাদিস

“এক ব্যবসায়ী মানুষকে ঋণ দিত। কাউকে অভাবগ্রস্ত দেখলে সে তার কর্মচারীদের বলত: তাকে ছাড় দাও, হয়তো আল্লাহও আমাদের ছাড় দেবেন। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৭৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৬২ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

ঋণ থেকে মুক্তির দোয়া

দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ

“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে গুনাহ ও ঋণ থেকে আশ্রয় চাই।” নবীজি ﷺ নামাজে প্রায়ই এ দোয়া করতেন। আয়েশা (রা.) কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: “মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বললে মিথ্যা বলে, আর ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৩২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৯ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত

ব্যবহারিক পরামর্শ: যেকোনো ঋণ, পরিমাণ যত ছোটই হোক, তারিখ ও সাক্ষীসহ লিখে রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নেবেন না। আর ঋণ নিলে সামর্থ্য হওয়ামাত্র পরিশোধ করুন।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২:২৮০, ২:২৮২, ৪:৫৮ • সহিহ বুখারি: ৩৩, ৮৩২, ২০৭৮, ২২৮৭, ২২৮৯, ২৩৮৭, ২৩৯৩ • সহিহ মুসলিম: ৫৯, ৫৮৯, ১৫৬২, ১৫৬৪, ১৬০১, ১৮৮৬

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *