☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

যাকাতের বিধান ও সদকার ফজিলত: কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে

যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটি সম্পদকে পবিত্র করে, সমাজে অভাবগ্রস্ত মানুষের হক আদায় করে, আর দাতার অন্তর থেকে কৃপণতা দূর করে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে যাকাতের বিধান ও সদকার ফজিলত তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. যাকাতের উদ্দেশ্য
  2. যাকাত না দেওয়ার পরিণতি
  3. নিসাব ও যাকাতের হার
  4. যাকাতের আটটি খাত
  5. নফল সদকার ফজিলত

যাকাতের উদ্দেশ্য

কুরআন

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا

“তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।”

সূরা আত-তাওবা ৯:১০৩

হাদিস

নবীজি ﷺ মুআজ ইবনু জাবালকে (রা.) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় বলেছিলেন, তাদের জানিয়ে দেবে যে আল্লাহ তাদের সম্পদে যাকাত ফরজ করেছেন। এটি তাদের ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত

যাকাত না দেওয়ার পরিণতি

যারা সোনা-রুপা জমা করে রাখে অথচ আল্লাহর পথে খরচ করে না, সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪–৩৫-এ তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দেওয়া হয়েছে। জাহান্নামের আগুনে সেই সম্পদ উত্তপ্ত করে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে।

হাদিস

“আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, অথচ সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টাকওয়ালা বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। সাপটি তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে এবং তার দুই চোয়াল কামড়ে ধরে বলবে: আমিই তোমার সম্পদ, আমিই তোমার জমা করা ধন।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪০৩ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

নিসাব ও যাকাতের হার

হাদিস

“পাঁচ উকিয়ার কম রুপায় যাকাত নেই, পাঁচটির কম উটে যাকাত নেই, এবং পাঁচ ওয়াসকের কম (শস্য/খেজুরে) যাকাত নেই।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭৯ — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত

পাঁচ উকিয়া হলো ২০০ দিরহাম। আলি (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ২০০ দিরহামে এক বছর পূর্ণ হলে ৫ দিরহাম যাকাত দিতে হবে, আর সোনার ক্ষেত্রে ২০ দিনারে এক বছর পূর্ণ হলে অর্ধ দিনার (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৫৭৩)। অর্থাৎ নগদ অর্থ ও সোনা-রুপায় যাকাতের হার ২.৫% (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ)।

আধুনিক হিসাবে আলেমগণ সাধারণত সোনার নিসাব প্রায় ৮৫ গ্রাম (সাড়ে ৭ ভরি) এবং রুপার নিসাব প্রায় ৫৯৫ গ্রাম (সাড়ে ৫২ ভরি) ধরেন। ওজনের এই রূপান্তরে সামান্য ভিন্নমতও আছে।

গুরুত্বপূর্ণ: যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক চান্দ্র বছর মালিকানায় থাকা শর্ত। ব্যবসার পণ্য, ঋণ ও মিশ্র সম্পদের হিসাব জটিল হতে পারে। তাই নিজের অবস্থা অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নিন।

যাকাতের আটটি খাত

কুরআন

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“যাকাত কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”

সূরা আত-তাওবা ৯:৬০

নফল সদকার ফজিলত

সূরা আল-বাকারা ২:২৬১-এ আল্লাহ উপমা দিয়েছেন: যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দান একটি শস্যদানার মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রতিটি শীষে থাকে একশ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান, আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।

হাদিস

مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ

“সদকা সম্পদ কমায় না।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

হাদিস

যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে এত গোপনে দান করে যে তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী দান করল।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪২৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৩১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ২:২৬১, ৯:৩৪–৩৫, ৯:৬০, ৯:১০৩ • সহিহ বুখারি: ১৩৯৫, ১৪০৩, ১৪২৩, ১৪৪৭ • সহিহ মুসলিম: ১৯, ৯৭৯, ১০৩১, ২৫৮৮ • সুনান আবু দাউদ: ১৫৭৩

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *