কুরআনের শেষ তিনটি সূরা, অর্থাৎ আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস, আকারে ছোট হলেও মর্যাদায় অনেক বড়। প্রথমটি তাওহিদের পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা, আর শেষ দুটি সব অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা। নবীজি ﷺ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে এগুলো পড়তেন। এ তিন সূরার অর্থ, শিক্ষা ও ফজিলত তুলে ধরা হলো।
- সূরা আল-ইখলাস: অর্থ ও শিক্ষা
- কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান
- এ সূরার প্রতি ভালোবাসায় আল্লাহর ভালোবাসা
- সূরা আল-ফালাক: অর্থ ও শিক্ষা
- সূরা আন-নাস: অর্থ ও শিক্ষা
- এমন আয়াত আর কখনো দেখা যায়নি
- প্রতিদিনের আমল
সূরা আল-ইখলাস: অর্থ ও শিক্ষা
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী)। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”
সূরা আল-ইখলাস ১১২:১–৪
শিক্ষা: চার আয়াতে তাওহিদের চারটি দিক: আল্লাহ এক; সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন; তাঁর কোনো সন্তান বা পিতা-মাতা নেই; আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। এ সূরা শিরকের সব রূপকে প্রত্যাখ্যান করে।
কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান
“যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! নিশ্চয়ই এটি (সূরা আল-ইখলাস) কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০১৩ — আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে; অনুরূপ সহিহ মুসলিম ৮১১
এ সূরার প্রতি ভালোবাসায় আল্লাহর ভালোবাসা
নবীজি ﷺ এক ব্যক্তিকে একটি অভিযানে আমির বানিয়ে পাঠালেন। তিনি নামাজে সাথীদের ইমামতি করতেন এবং প্রতিটি কিরাত “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ” দিয়ে শেষ করতেন। ফিরে এসে সাথীরা বিষয়টি নবীজিকে ﷺ জানালেন। তিনি বললেন, তাকে জিজ্ঞেস করো কেন সে এমন করে? লোকটি বলল: কারণ এতে রহমানের (আল্লাহর) গুণাবলি রয়েছে, আর আমি তা পড়তে ভালোবাসি। নবীজি ﷺ বললেন: “তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৩৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১৩ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
সূরা আল-ফালাক: অর্থ ও শিক্ষা
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِن شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
“বলুন, আমি আশ্রয় চাই প্রভাতের রবের কাছে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে যখন তা গভীর হয়, গিঁটে ফুঁ দেওয়া জাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে, এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।”
সূরা আল-ফালাক ১১৩:১–৫
শিক্ষা: এ সূরায় বাইরের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে: সৃষ্টির সাধারণ ক্ষতি, রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বিপদ, জাদু এবং হিংসা। একমাত্র আল্লাহই এসব থেকে রক্ষা করতে পারেন।
সূরা আন-নাস: অর্থ ও শিক্ষা
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَٰهِ النَّاسِ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
“বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের ইলাহর কাছে, সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে (আল্লাহর নাম শুনলে) পিছিয়ে যায়, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, জিনদের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে।”
সূরা আন-নাস ১১৪:১–৬
শিক্ষা: এ সূরায় ভেতরের শত্রু, অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আল্লাহর তিনটি গুণ (রব, মালিক, ইলাহ) উল্লেখ করে আশ্রয় চাওয়ায় বোঝা যায়, অন্তরের কুমন্ত্রণা সবচেয়ে বিপজ্জনক। “খান্নাস” মানে যে আল্লাহর যিকির শুনলে পিছিয়ে যায়। তাই যিকিরই ওয়াসওয়াসার প্রতিষেধক।
এমন আয়াত আর কখনো দেখা যায়নি
“তুমি কি দেখোনি, আজ রাতে এমন কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে যার মতো আর কখনো দেখা যায়নি? সেগুলো হলো ‘কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক’ এবং ‘কুল আউযু বিরাব্বিন নাস’।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮১৪ — উকবা ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত
প্রতিদিনের আমল
- সকাল ও সন্ধ্যায়: তিনটি সূরা তিনবার করে পড়া। এগুলো সবকিছু থেকে যথেষ্ট হবে (সুনান আবু দাউদ ৫০৮২; জামে তিরমিজি ৩৫৭৫, হাসান সহিহ)।
- ঘুমানোর আগে: দুই হাতের তালুতে তিন সূরা পড়ে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করা, তিনবার (সহিহ বুখারি ৫০১৭)।
- প্রতিটি ফরজ নামাজের পর: মুআওবিযাত (আশ্রয় প্রার্থনার সূরা) পড়া (সুনান আবু দাউদ ১৫২৩; জামে তিরমিজি ২৯০৩, সহিহ)।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১১২:১–৪, ১১৩:১–৫, ১১৪:১–৬ • সহিহ বুখারি: ৫০১৩, ৫০১৭, ৭৩৭৫ • সহিহ মুসলিম: ৮১১, ৮১৩, ৮১৪ • আবু দাউদ: ১৫২৩, ৫০৮২ • তিরমিজি: ২৯০৩, ৩৫৭৫
Leave a Reply