☪কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে
🌐

অজুর সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

অজু নামাজের চাবি, আর সুন্দরভাবে অজু করলে গুনাহ ঝরে যায়। সাহাবিরা নবীজির ﷺ অজু নিজ চোখে দেখে হুবহু বর্ণনা করেছেন, যাতে উম্মত সেভাবে অজু করতে পারে। সহিহ হাদিসের আলোকে ধাপে ধাপে নবীজির ﷺ অজুর পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

📑 সূচিপত্র

  1. অজুর ফরজ অঙ্গ: কুরআনের নির্দেশ
  2. উসমান (রা.)-এর বর্ণনায় নবীজির ﷺ অজু
  3. ধাপে ধাপে অজুর পদ্ধতি
  4. মাথা মাসেহের পদ্ধতি
  5. ডান দিক থেকে শুরু
  6. আঙুল খিলাল ও পূর্ণাঙ্গ অজু
  7. গোড়ালি শুকনো না থাকা
  8. পানির অপচয় নয়
  9. অজুর পরের দোয়া

অজুর ফরজ অঙ্গ: কুরআনের নির্দেশ

কুরআন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ

“হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াতে চাও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো।”

সূরা আল-মায়িদা ৫:৬

এ আয়াতে উল্লিখিত চারটি কাজ অজুর মৌলিক অংশ, এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে: মুখমণ্ডল ধোয়া, কনুইসহ দুই হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ করা এবং টাখনুসহ দুই পা ধোয়া।

উসমান (রা.)-এর বর্ণনায় নবীজির ﷺ অজু

হাদিস

উসমান (রা.) অজুর পানি চাইলেন। তারপর পাত্র থেকে দুই হাতে তিনবার পানি ঢেলে হাত ধুলেন। এরপর ডান হাত পাত্রে ঢুকিয়ে পানি নিয়ে কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে ঝেড়ে ফেললেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধুলেন, এবং কনুই পর্যন্ত দুই হাত তিনবার ধুলেন। তারপর মাথা মাসেহ করলেন। এরপর টাখনু পর্যন্ত দুই পা তিনবার করে ধুলেন। তারপর বললেন, আমি নবীজিকে ﷺ আমার এই অজুর মতো অজু করতে দেখেছি।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬

ধাপে ধাপে অজুর পদ্ধতি

  1. নিয়ত: অন্তরে অজুর নিয়ত করা (সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, সহিহ বুখারি ১)। অজুর শুরুতে “বিসমিল্লাহ” বলা। এ বিষয়ের হাদিসগুলোকে অনেক মুহাদ্দিস সমষ্টিগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
  2. দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধোয়া: তিনবার।
  3. কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া: তিনবার। রোজাদার না হলে নাকে ভালোভাবে পানি দেওয়া।
  4. মুখমণ্ডল ধোয়া: কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত, এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত, তিনবার।
  5. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া: প্রথমে ডান হাত, তারপর বাম হাত, তিনবার করে।
  6. মাথা মাসেহ করা: ভেজা হাতে একবার।
  7. দুই কান মাসেহ করা।
  8. দুই পা টাখনুসহ ধোয়া: প্রথমে ডান পা, তারপর বাম পা, তিনবার করে।

নবীজি ﷺ কখনো কখনো প্রতিটি অঙ্গ একবার করে (সহিহ বুখারি ১৫৭) এবং কখনো দুইবার করে (সহিহ বুখারি ১৫৮) ধুয়েছেন। অর্থাৎ একবার ফরজ, আর তিনবার পর্যন্ত সুন্নাত।

মাথা মাসেহের পদ্ধতি

হাদিস

আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ (রা.) নবীজির ﷺ অজু দেখিয়ে বলেন, তিনি দুই হাত দিয়ে মাথা মাসেহ করলেন: মাথার সামনের অংশ থেকে শুরু করে হাত দুটি ঘাড়ের দিকে নিয়ে গেলেন, তারপর যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানে ফিরিয়ে আনলেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৫ (সংক্ষেপিত)

ডান দিক থেকে শুরু

হাদিস

আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন এবং তাঁর সব কাজে ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৮

আঙুল খিলাল ও পূর্ণাঙ্গ অজু

হাদিস

أَسْبِغِ الْوُضُوءَ، وَخَلِّلْ بَيْنَ الْأَصَابِعِ، وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا

“পরিপূর্ণভাবে অজু করো, আঙুলগুলোর মাঝে খিলাল করো, আর রোজাদার না হলে নাকে ভালোভাবে পানি দাও।”

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৪২; জামে তিরমিজি, হাদিস ৭৮৮ (সহিহ) — লাকিত ইবনু সাবিরা (রা.) থেকে বর্ণিত

গোড়ালি শুকনো না থাকা

হাদিস

নবীজি ﷺ কিছু লোককে দেখলেন, তাড়াহুড়া করে অজু করায় তাদের গোড়ালি শুকনো রয়ে গেছে। তিনি উচ্চস্বরে বললেন: “গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের দুর্ভোগ! পরিপূর্ণভাবে অজু করো।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪১ — আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত

তাই অজুর অঙ্গগুলোর কোনো অংশ যেন শুকনো না থাকে, বিশেষ করে গোড়ালি, কনুই ও আঙুলের ফাঁক, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পানির অপচয় নয়

হাদিস

আনাস (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ এক মুদ (প্রায় দুই আঁজলা ভরা পরিমাণ) পানি দিয়ে অজু করতেন, আর এক সা থেকে পাঁচ মুদ পানি দিয়ে গোসল করতেন।

সহিহ বুখারি, হাদিস ২০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩২৫

কল খুলে রেখে অজু করার সময় এ হাদিসটি মনে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করাই সুন্নাত।

অজুর পরের দোয়া

দোয়া

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসুল।” পরিপূর্ণভাবে অজু করে এ দোয়া পড়লে জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৪ — উমর (রা.) থেকে উকবা ইবনু আমির (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত

ফিকহি নোট: কুলি, নাকে পানি দেওয়া, কান মাসেহ এবং অঙ্গগুলোর ধারাবাহিকতা ফরজ নাকি সুন্নাত, তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। তবে ওপরে বর্ণিত সুন্নাহসম্মত পূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করাই নিরাপদ ও উত্তম।

📚 তথ্যসূত্র

আল-কুরআন: ৫:৬ • সহিহ বুখারি: ১, ৬০, ১৫৭, ১৫৮, ১৫৯, ১৬৮, ১৮৫, ২০১ • সহিহ মুসলিম: ২২৬, ২৩৪, ২৩৫, ২৪১, ২৬৮, ৩২৫ • আবু দাউদ ১৪২ • তিরমিজি ৭৮৮

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *