মাত্র তিন আয়াতের ছোট্ট একটি সূরা, অথচ এতে রয়েছে মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার পূর্ণ মানদণ্ড। ইমাম ইবনু কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর উক্তি উল্লেখ করেছেন: মানুষ যদি শুধু এই সূরাটি নিয়ে চিন্তা করত, তবে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। সূরা আল-আসরের ব্যাখ্যা এবং সময়ের মূল্য নিয়ে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- সূরা আল-আসর
- সময়ের শপথ
- ক্ষতি থেকে বাঁচার চার শর্ত
- দুটি নিয়ামত, যাতে মানুষ ধোঁকায় পড়ে
- জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব
- অল্প হলেও নিয়মিত আমল
সূরা আল-আসর
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
“সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।”
সূরা আল-আসর ১০৩:১–৩
সময়ের শপথ
আল্লাহ যখন কোনো কিছুর শপথ করেন, তখন তার গুরুত্ব বোঝানোই উদ্দেশ্য। এখানে সময়ের শপথ করে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের জীবনের প্রকৃত মূলধন হলো সময়। প্রতিটি দিন চলে যাওয়া মানে জীবনের একটি অংশ শেষ হয়ে যাওয়া।
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
“তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?”
সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১১৫
ক্ষতি থেকে বাঁচার চার শর্ত
- ঈমান: আল্লাহ, রাসুল ও আখিরাতের প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাস। এটিই সব আমলের ভিত্তি।
- সৎকাজ: ঈমানের দাবি অনুযায়ী ফরজ-ওয়াজিব পালন এবং সাধ্যমতো নফল ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
- সত্যের উপদেশ: শুধু নিজে ভালো থাকা যথেষ্ট নয়, অন্যকেও সত্যের দিকে ডাকা। এটি দাওয়াত ও পারস্পরিক নসিহতের দায়িত্ব।
- ধৈর্যের উপদেশ: সত্যের পথে চলতে গেলে বাধা আসবেই। তাই পরস্পরকে ধৈর্য ধরতে উৎসাহিত করা।
লক্ষণীয়, প্রথম দুটি নিজের সংশোধনের সঙ্গে, আর শেষ দুটি সমাজের সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ সফলতার জন্য দুটিই জরুরি।
দুটি নিয়ামত, যাতে মানুষ ধোঁকায় পড়ে
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নিয়ামত এমন, যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে (ক্ষতিগ্রস্ত হয়): সুস্থতা ও অবসর সময়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব
“কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা ততক্ষণ সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে: তার জীবন সে কীসে শেষ করেছে, তার জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় খরচ করেছে, এবং তার শরীর কীসে ক্ষয় করেছে।”
জামে তিরমিজি, হাদিস ২৪১৭ (হাসান সহিহ) — আবু বারযা আল-আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত
أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ
(জাহান্নামবাসীদের বলা হবে:) “আমি কি তোমাদের এতটা আয়ু দিইনি, যাতে কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে চাইলে করতে পারত? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল।”
সূরা ফাতির ৩৫:৩৭
অল্প হলেও নিয়মিত আমল
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল সেটি, যা নিয়মিত করা হয়, পরিমাণে অল্প হলেও।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৮৩ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২৩:১১৫, ৩৫:৩৭, ১০৩:১–৩ • সহিহ বুখারি: ৬৪১২, ৬৪৬৪ • সহিহ মুসলিম: ৭৮৩ • তিরমিজি ২৪১৭ • তাফসির ইবনু কাসির (সূরা আল-আসর)
Leave a Reply