হজের প্রায় প্রতিটি আমলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইবরাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগ, তাওয়াক্কুল ও আনুগত্যের ইতিহাস। কাবা নির্মাণ, সাফা-মারওয়ার সাঈ, জমজম, মাকামে ইবরাহিম ও কুরবানি, সবকিছুতেই এই পরিবারের স্মৃতি। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সেই ইতিহাস ও শিক্ষা তুলে ধরা হলো।
- জনমানবহীন উপত্যকায় পরিবার রেখে আসা
- হাজেরা (আ.)-এর তাওয়াক্কুল ও সাফা-মারওয়া
- জমজমের উৎপত্তি
- কাবা নির্মাণ ও কবুলের দোয়া
- মাকামে ইবরাহিম
- হজের ঘোষণা
- মহান কুরবানি
জনমানবহীন উপত্যকায় পরিবার রেখে আসা
رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
“হে আমাদের রব, আমি আমার বংশধরদের একাংশকে আপনার সম্মানিত ঘরের কাছে এক অনুর্বর উপত্যকায় বসবাস করিয়েছি। হে আমাদের রব, যাতে তারা নামাজ কায়েম করে। অতএব, মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দিন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”
সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৭
আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয় মক্কার দিকে ছুটে যায়, আর সেই অনুর্বর উপত্যকায় পৃথিবীর সব প্রান্তের ফলমূল পাওয়া যায়। এটি ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া কবুলের জীবন্ত নিদর্শন।
হাজেরা (আ.)-এর তাওয়াক্কুল ও সাফা-মারওয়া
ইবরাহিম (আ.) স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে কাবার কাছে রেখে ফিরে যাচ্ছিলেন। হাজেরা (আ.) বারবার জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের এমন জায়গায় রেখে কোথায় যাচ্ছেন যেখানে কোনো মানুষ বা কিছুই নেই? ইবরাহিম (আ.) কোনো উত্তর দিলেন না। তখন হাজেরা (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কি আপনাকে এর আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা (আ.) বললেন: “তাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।”
পরে পানি ফুরিয়ে গেলে শিশু ইসমাইল পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন। হাজেরা (আ.) পানির খোঁজে সাফা পাহাড়ে উঠলেন, তারপর মারওয়া পাহাড়ে। এভাবে সাতবার দৌড়ালেন। নবীজি ﷺ বলেছেন: “এ কারণেই মানুষ এ দুই পাহাড়ের মাঝে সাঈ করে।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত (সংক্ষেপিত)
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَائِرِ اللَّهِ
“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।”
সূরা আল-বাকারা ২:১৫৮
জমজমের উৎপত্তি
একই হাদিসে এসেছে, সপ্তমবার মারওয়ায় পৌঁছে হাজেরা (আ.) একটি আওয়াজ শুনলেন। দেখলেন, জমজমের স্থানে একজন ফেরেশতা (জিবরিল) মাটিতে আঘাত করছেন, আর সেখান থেকে পানি বের হচ্ছে। হাজেরা (আ.) পানির চারপাশে বাঁধ দিতে লাগলেন। নবীজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ ইসমাইলের মায়ের ওপর রহম করুন! তিনি যদি জমজমকে (বাঁধ না দিয়ে) ছেড়ে দিতেন, তবে তা একটি প্রবহমান ঝরনায় পরিণত হতো (সহিহ বুখারি ৩৩৬৪)।
কাবা নির্মাণ ও কবুলের দোয়া
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
“আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের ভিত্তি উঁচু করছিলেন (তখন তাঁরা দোয়া করছিলেন): হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
সূরা আল-বাকারা ২:১২৭
শ্রেষ্ঠ একটি আমল করার পরও তাঁরা অহংকার না করে কবুলের দোয়া করেছেন। এটিই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
পরের আয়াতগুলোতে (২:১২৮–১২৯) তাঁরা দোয়া করেন, তাঁদের বংশধরদের মধ্য থেকে যেন একজন রাসুল পাঠানো হয়, যিনি আয়াত তিলাওয়াত করবেন, কিতাব ও হিকমত শেখাবেন এবং মানুষকে পরিশুদ্ধ করবেন। মুহাম্মাদ ﷺ ছিলেন সেই দোয়ার বাস্তবায়ন।
মাকামে ইবরাহিম
وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى
“আর তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান বানাও।”
সূরা আল-বাকারা ২:১২৫
হজের ঘোষণা
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ
“আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটে চড়ে, দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে।”
সূরা আল-হজ ২২:২৭
মহান কুরবানি
قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে নিজেকে পুত্রকে জবাই করতে দেখার কথা জানালে পুত্র বললেন: “হে আমার বাবা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০২
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
“আর আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানির বিনিময়ে।”
সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ২:১২৫, ২:১২৭–১২৯, ২:১৫৮, ১৪:৩৭, ২২:২৭, ৩৭:১০২–১০৭ • সহিহ বুখারি: ৩৩৬৪
Leave a Reply