মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু আমল এমন, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও কবরে পৌঁছাতে থাকে। এগুলোকেই বলা হয় সদকায়ে জারিয়া বা চলমান দান। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সদকায়ে জারিয়ার রূপ ও ফজিলত তুলে ধরা হলো।
- আমল ও তার প্রভাব লিপিবদ্ধ হয়
- মৃত্যুর পরও যে তিন আমল চলে
- সাতটি চলমান আমল
- ওয়াকফ: উমর (রা.)-এর দৃষ্টান্ত
- গাছ লাগানো ও চাষাবাদ
- ভালো কাজের প্রচলন
- মৃত বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে দান
আমল ও তার প্রভাব লিপিবদ্ধ হয়
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ
“নিশ্চয়ই আমিই মৃতদের জীবিত করি, আর লিখে রাখি তারা যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পেছনে রেখে গেছে (তাদের কাজের প্রভাব)।”
সূরা ইয়াসিন ৩৬:১২
মৃত্যুর পরও যে তিন আমল চলে
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়, এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
সাতটি চলমান আমল
“মুমিনের মৃত্যুর পর তার যেসব আমল ও নেকি তার কাছে পৌঁছায়, সেগুলো হলো: যে জ্ঞান সে শিখিয়েছে ও প্রচার করেছে, যে নেক সন্তান সে রেখে গেছে, যে কুরআন (মুসহাফ) সে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে, যে মসজিদ সে নির্মাণ করেছে, মুসাফিরদের জন্য যে ঘর সে বানিয়েছে, যে নালা বা খাল সে প্রবাহিত করেছে, এবং সুস্থ ও জীবিত অবস্থায় নিজ সম্পদ থেকে যে সদকা সে দিয়েছে। মৃত্যুর পর এগুলোর সওয়াব তার কাছে পৌঁছাতে থাকে।”
সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস ২৪২ (শাইখ আলবানি: হাসান) — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
ওয়াকফ: উমর (রা.)-এর দৃষ্টান্ত
উমর (রা.) খায়বারে একখণ্ড জমি পেয়ে নবীজির ﷺ কাছে এসে পরামর্শ চাইলেন। নবীজি ﷺ বললেন: “তুমি চাইলে মূল জমিটি রেখে দিতে পারো এবং এর উৎপাদিত ফসল সদকা করতে পারো।” তখন উমর (রা.) জমিটি এমনভাবে ওয়াকফ করলেন যে তা বিক্রি, দান বা উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর করা যাবে না। এর আয় দরিদ্র, আত্মীয়স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহর পথ, মুসাফির ও মেহমানদের জন্য নির্ধারিত হলো।
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩২ — ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত
গাছ লাগানো ও চাষাবাদ
“কোনো মুসলিম যদি গাছ লাগায় বা ফসল বোনে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা পশু খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৫৩ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
ভালো কাজের প্রচলন
“যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো রীতির প্রচলন করে, সে তার সওয়াব পাবে, এবং তার পরে যারা সে অনুযায়ী আমল করবে তাদের সওয়াবও পাবে, অথচ তাদের সওয়াব একটুও কমবে না।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৭ — জারির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত
হাদিসটির প্রেক্ষাপট ছিল দান। একজন সাহাবি প্রথমে দান নিয়ে এলে অন্যরাও তাঁর দেখাদেখি দান করতে শুরু করেন।
মৃত বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে দান
এক ব্যক্তি নবীজিকে ﷺ বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমার ধারণা, তিনি কথা বলতে পারলে সদকা করতেন। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? নবীজি ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০০৪ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত
সাদ ইবনু উবাদা (রা.)-এর মা মারা গেলে তিনি মায়ের পক্ষ থেকে নিজের একটি বাগান সদকা করে দেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৫৬)।
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ৩৬:১২ • সহিহ বুখারি: ১৩৮৮, ২৩২০, ২৭৩৭, ২৭৫৬ • সহিহ মুসলিম: ১০০৪, ১০১৭, ১৫৫৩, ১৬৩১, ১৬৩২ • ইবনু মাজাহ ২৪২
Leave a Reply