নবীজির ﷺ পুরো জীবনই ছিল দাওয়াতের জীবন। নিকটাত্মীয়দের ডাকা থেকে শুরু করে তায়েফে পাথরের আঘাত সহ্য করা, শত্রুর জন্যও হিদায়াতের দোয়া করা, অসুস্থ ইহুদি বালককে দেখতে যাওয়া, প্রতিটি ঘটনা দাওয়াতকারীদের জন্য আলোকবর্তিকা। সহিহ হাদিসের আলোকে নবীজির ﷺ দাওয়াতি জীবনের কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।
- বিশ্বজগতের জন্য রহমত
- নিকটাত্মীয়দের প্রতি প্রথম দাওয়াত
- তায়েফের দিন: প্রতিশোধ নয়, হিদায়াতের আশা
- মানুষের হিদায়াতের জন্য ব্যাকুলতা
- প্রত্যাখ্যানকারীর জন্যও দোয়া
- অসুস্থ ইহুদি বালকের কাছে দাওয়াত
- মায়ের জন্য আবু হুরায়রা (রা.)-এর দোয়া
বিশ্বজগতের জন্য রহমত
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
“আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।”
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭
নিকটাত্মীয়দের প্রতি প্রথম দাওয়াত
وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ
“আর আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।”
সূরা আশ-শুআরা ২৬:২১৪
এ আয়াত নাজিল হলে নবীজি ﷺ সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশের গোত্রগুলোকে ডাকলেন। সবাই জড়ো হলে তিনি বললেন: “আমি যদি বলি, এই পাহাড়ের ওপারে একদল অশ্বারোহী তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” তারা বলল: হ্যাঁ, আমরা কখনো আপনাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন: “তাহলে আমি তোমাদের এক কঠিন শাস্তির আগে সতর্ককারী।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৭৭০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০৮ — ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত
শিক্ষা: দাওয়াতের আগে নিজের সততা ও বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। নবুওয়াতের আগেই মক্কাবাসী তাঁকে “আল-আমিন” (বিশ্বস্ত) বলে জানত।
তায়েফের দিন: প্রতিশোধ নয়, হিদায়াতের আশা
আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন কি আপনার জীবনে এসেছে? নবীজি ﷺ তায়েফের দিনের কথা বললেন। সেদিন তায়েফবাসী তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল। দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে ফেরার পথে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে বললেন, আপনি চাইলে আমি দুই পাহাড় মিলিয়ে তাদের পিষে ফেলব। নবীজি ﷺ বললেন: “না, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৯৫
মানুষের হিদায়াতের জন্য ব্যাকুলতা
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا
“তারা যদি এই বাণীতে ঈমান না আনে, তবে কি তাদের পেছনে দুঃখে আপনি নিজেকে শেষ করে দেবেন?”
সূরা আল-কাহফ ১৮:৬
মানুষ হিদায়াত না পেলে নবীজি ﷺ এতটাই দুঃখিত হতেন যে আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। দাওয়াতকারীর অন্তরে মানুষের প্রতি এমন দরদই থাকা উচিত।
প্রত্যাখ্যানকারীর জন্যও দোয়া
তুফাইল ইবনু আমর আদ-দাওসি (রা.) এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, দাওস গোত্র অবাধ্য হয়েছে এবং (দাওয়াত) প্রত্যাখ্যান করেছে। আপনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। লোকেরা ভাবল, এবার দাওস ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হিদায়াত দিন এবং তাদের (মুসলিম হিসেবে) নিয়ে আসুন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৯৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫২৪ — আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
পরবর্তীতে দাওস গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) এই গোত্রেরই সদস্য ছিলেন।
অসুস্থ ইহুদি বালকের কাছে দাওয়াত
এক ইহুদি বালক নবীজির ﷺ খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে নবীজি ﷺ তাকে দেখতে গেলেন এবং তার মাথার কাছে বসে বললেন: “তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।” বালকটি পাশে থাকা বাবার দিকে তাকাল। বাবা বলল: আবুল কাসিমের (নবীজির) কথা মেনে নাও। বালকটি ইসলাম গ্রহণ করল। নবীজি ﷺ বের হওয়ার সময় বললেন: “সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করলেন।”
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৫৬ — আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত
মায়ের জন্য আবু হুরায়রা (রা.)-এর দোয়া
আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর মাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কিন্তু তিনি গ্রহণ করতেন না, বরং একদিন নবীজি ﷺ সম্পর্কে কটু কথা বললেন। আবু হুরায়রা (রা.) কাঁদতে কাঁদতে নবীজির ﷺ কাছে এসে মায়ের হিদায়াতের জন্য দোয়া চাইলেন। নবীজি ﷺ দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দিন।” আবু হুরায়রা (রা.) বাড়ি ফিরে দেখলেন, তাঁর মা গোসল করে কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৪৯১ (সংক্ষেপিত)
📚 তথ্যসূত্র
আল-কুরআন: ১৮:৬, ২১:১০৭, ২৬:২১৪ • সহিহ বুখারি: ১৩৫৬, ২৯৩৭, ৩২৩১, ৪৭৭০ • সহিহ মুসলিম: ২০৮, ১৭৯৫, ২৪৯১, ২৫২৪
Leave a Reply